সিলেট অঞ্চলের বিস্মৃত সংস্কৃতি

0
11

বাংলা সংস্কৃতিঃ

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কিছু ঝরে যাওয়া সংস্কৃতি আমার মন ও মননে নাড়া দিয়ে যায় বারবার। যে সব স্মৃতি আজও দোলা দেয়, তেমনি কিছু স্মৃতি নিয়ে এবার সামান্য কিছু লেখার প্রয়াস পেলাম। শীত মৌসুমে স্কুল ছুটিতে যখন গ্রামের বাড়ি যেতাম তখন মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীতের রাতে শুনতাম অনেক লোকের শোরগোল এবং জারিগানের আওয়াজ। মনে কৌতূহল জাগত। একদিন রাতে আমাদের বাড়িতেও এরূপ লোক সমাগম হলো। ১৫-২০ জন তরুণ মিলে জারি গানের সুরে প্রথমে দলের নেতা ছন্দাকারে গান শুরু করত, পরে বাকি লোক একই লাইন সুর করে গাইত; প্রথমে একটু বুঝতে কষ্ট হলেও পরে বুঝলাম। ওরা গাইছে এ রকম—
‘আইলামরে আইলামরে,
আইলামরে তালুকদার বাড়ি
গইন্না মাছের পেরপেরি
শুনরে ভাই বরোয়া বাঁশ
এই বাড়ির আশপাশ
আশপাশের নীল ছুয়া
হাত বাড়াইয়া পাইলাম গুয়া (সুপারি)
মাথা ভরি মাখলাম তেল
ও বাঘা বন গেল
বন গিয়া ধরল গাই
গাই ডাখে মাই মাই
এখ ও বেটি এখ এখ জাত
পিঠা করে নানান জাত
খাইতে পুট্টুরি উঠে
নাখে তাউল্লায় জইল্লা উঠে
শেষ লাইন আগো,
মাঘাই সিন্নি মাগো

এসব জারিগানে ছিল বিশেষ বর্ণনার ঘনঘটা। কারও মতে মাগাই শিন্নি। ভিক্ষাবৃত্তি করে যে শিরনি করা হয়, তাকে মাগাই শিন্নি বলে। আবার কেউ কেউ বলেন, এটি হচ্ছে বাঘাই সিন্নি, বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে প্রাচীন আমলে এরকম প্রথা চালু ছিল। এসব গানে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের সুরের মিশ্রণে গানগুলো গীত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। মাঘাই শিরনির আরেকটা জারি গান এ রকম—

মেঘ পরে ভাই পিনুর পিনুর
খৈ জাইতায় রে ভাই
সোনার ছাত্তি মাথায় দিয়া
বাঘ শিকারে যাই।
এক বাঘ মারিলাম ভাই
চিতলিয়ার পারে,
আর এক বাঘে খুঠি ধরল
জংগলার কিনারে,
এই জংগল কি হইল
কাইট্টারায় জ্বালাইল।
এই ছালি কি হইল
ধোপায় কাপড় ধইল।
আগো, মাঘাই শিরনি মাগ”

গান শেষ করার পর বাড়ির মালিককে কিছু দান করতে হত। কেউ দিত চাল, কেউ নগদ টাকা-পয়সা। কেউ কিছু না দিলে ছন্দের সুরে তাকে গালি খেতে হত। পরে জানলাম, ওই সংগ্রহকৃত চাল ও টাকা দিয়ে ওরা বিরাট ক্ষীর (পায়েস) শিরনির আয়োজন করত। মাঝে মধ্যে আমিও তাদের দলে যোগ দিতাম। মাঘের শীতে চাদর মোড়া দিয়ে তাদের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি হাঁটতাম আর তাদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে এসব গান গাইতাম। এসব গানের কে ছিল রচয়িতা, আর ওরাই বা কীভাবে সংগ্রহ করল, কিছুই জানতাম না। আমার মনে হয়, যারা গাইতো তারাও কিছু জানত না। একে অন্যের মুখ থেকে শুনে শুনে বাংলার লোক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। গ্রাম বাংলার এসব লোক সংস্কৃতি আজকাল খুঁজে পাওয়া যায় না।
গ্রাম বাংলার আরেক লোক সংস্কৃতি ছিল নৌকা বাইচ। বৃহত্তর সিলেটের গ্রামে বর্ষাকালে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা হতো। লন্ডনপ্রবাসীরা সাধারণত এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। কেউ কেউ নিজেরা উৎসাহিত হয়ে এই ধরনের নৌকা তৈরি করাতেন। ৫০-৫৫ হাত লম্বা করে একেকটি নৌকা তৈরি করা হতো এবং তাতে বিভিন্ন রঙের কারুকাজ থাকত। আবার কোন কোন নৌকার আগা গলুইয়ে বেশ বড় আকারের টিন দিয়ে তৈরি ময়ূর বসানো হত, টিন কেটে কেটে এই ময়ূরের আকৃতি করা হত। এই নৌকার নাম দেওয়া হত ময়ূরওয়ালা নৌকা। এসব নৌকা চালাতে প্রায় ৪০-৪৫ জন লোকের প্রয়োজন হত, এই লোকজনকে তিন ভাগে ভাগ করা হত। যেমন খারালি, পাইক, বাদ্যযন্ত্রী, পাইকের মধ্যখানে ৪-৫ জন লোক ঢোল করতাল আর কাঁসরঘণ্টা নিয়ে সারি গানের তালে তালে বাদ্য বাজাত।

সারি গানের ছন্দ এমন,
১. সোনার নায়ে রুপার বইঠা
কে বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে
ময়ূর পংকি নায়।
আগার পাইকা পাছায় গেলে
নায়ে শূন্যে করে উড়া
পিছের বইঠায় মারে টান
নায়ের বাড়ে এক গুরা,
ও কি সাবাস সাবাস হৈয়া।

২. কোন মেস্তরি নাও বানাইল
তারে দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে
ময়ূর পংকি নায়।

(প্রথম গান সংগৃহীত এবং দ্বিতীয় গানের রচয়িতা প্রয়াত বাউল শাহ আবদুল করিম)
এসব সারিগান গাওয়া হতো প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে, প্রতিযোগিতা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে গানের সুর এবং বাজনার তালে পরিবর্তন আসত, বাজনা দ্রুতগতিতে বাজতো আর মুখে বলা হত—
বাইওরে হৈয়া
আরও জুরে হৈয়া
জুরছে মার হৈয়া।

এক সময় প্রতিযোগিতার সমাপ্তি টানা হতো যখন প্রতিযোগিতার নির্ধারিত স্থানে অর্থাৎ শেষ সীমানায় নৌকাগুলো পৌঁছে যেত। তখন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণের পালা, স্থান নির্ধারণের জন্য প্রত্যেক নৌকায় একজন করে বিচারক দেওয়া হত। স্থানীয় ভাষায় এই বিচারককে আমিন বলা হত। আমিন ফলাফল ঘোষণা করতেন। তারপর পুরস্কার বিতরণ, এরপর শুরু হতো আর এক ধরনের সারি গান যেমন—

বিলপারের ময়না মিয়া
বড় ভাগ্যবান
সোনার বাটায় পান খাবাইয়া
পাঠা (ভেড়া) করলা দান।

এসব নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে পাটা (পুরুষ ভেড়া) দেওয়া হত, কারণ এতে খাবার-দাবারের ব্যাপার ছিল। এরূপ অনেক পালাপার্বন আচার-অনুষ্ঠানে মুখরিত থাকত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গ্রাম্য সংস্কৃতি। অগ্রহায়ণের নবান্নের পরপরই শুরু হত আরেক সংস্কৃতি, সেটা ছিল গাজির গান। যিনি গাজির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন, তার পোশাক-আশাক হতো অন্য ধরনের। ধুতির সঙ্গে শেরওয়ানি আর বিশেষ ধরনের পাগড়ি। হাতে থাকবে একটা আশা (ত্রিশূল) আর সঙ্গে দুজন লোক। গাজী প্রথমে আশাটা মাটির মধ্যে পুতে চাঁদতারা খচিত ত্রিপাল টানিয়ে মঞ্চ তৈরি করতেন, তারপর বন্দনা গেয়ে আসরের কাজ শুরু করতেন। বন্দনা গানটি ছিল নিম্নরূপ—
পূবেতে বন্দনা করি পুবে উদয় সূর্য
একদিকে উদয় হয়ে চারদিকে পসর
পশ্চিমে বন্দনা করি মক্কা ভালো স্থান
যেখানেতে পয়দা হলো কিতাব আর কোরআন
উত্তরে বন্দনা করি হিমালয় পর্বত
যেখানেতে জন্ম নিছে মালামের পাথর
দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদহ সাগর
যেখানে বাণিজ্য করে চাঁদ সওদাগর’

বন্দনা শেষে গাজী তার দুই সঙ্গী নিয়ে শুরু করতেন ধান চাল সংগ্রহের কাজ। আজকাল যুগের বিবর্তনে এসব সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। হারিয়ে ফেলেছে তার রূপলাবণ্য, বৃহত্তর সিলেটের সংস্কৃতি এখন রূপ নিয়েছে ভিন্ন ধারায় ভিন্ন আঙ্গিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here