বাংলাদেশের লোক উৎসব ও লোক সংস্কার

0
14

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
বাংলাদেশের লোকায়ত সমাজ কৃষিভিত্তিক বস্তুত কৃষি নির্ভর। আর এ কারনেই এখানকার জন-জীবন কৃষিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। প্রাত্যহিক জীবনাচার থেকে শুরু করে লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, লোকনৃত্য,লোকক্রীড়া প্রভৃতি লোকসংস্কৃতির মাঝে কৃষিভিত্তিক জীবনাচারেরই প্রতিফলন ঘটে। মধ্যযুগে ও এ শতাব্দীর তিরিশ চল্লিশ দশক পর্যন্ত যেসব পালা পার্বণ কে কেন্দ্র করে যেসব গানের আসর বসত, যাত্রাপালার আসর বসত ,গ্রামের মানুষ তা শ্রোতার আসনে বসে সারারাত জেগে উপভোগ করত আর তাদের সঙ্গস্কৃতির পিপাসা মেটাত। মেলাও জমে উঠত। এসব মেলায় নকশী কাঁথা,পাটি,মাটির পুতুল, সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় সখের হাঁড়ি পাওয়া যেত। এছাড়াও মেলায় পাওয়া যেত মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা, কাঠের ও লোহার তৈরী জিনিস পত্র। এসব মেলায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সমবেত হত। এছাড়া ঈদ,মহররম, দূর্গাপূজা, রথযাত্রা প্রভৃতি ধর্মীয় পর্বকে কেন্দ্র করেও জাকজমক মেলা বসত। আর বঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বৈশাখী মেলা তো আছেই। আজ অত কিছু না থাকলেও যা আছে তার সংখ্যাও কম নয়। বাঙ্গালীর এই সব ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এখনোও চলে নানা আয়োজন।

(ক) নববর্ষঃ

বর্ষচক্রের প্রথম মাসের প্রথম দিন সম্পর্কে এদেশের কৃষিজীবি মানুষের কিছু সহজাত বিশ্বাস-সংস্কার রয়েছে। যেসবের মুলে রয়েছে কৃষিজীবি সমাজের প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা। মুলত এসবকে কেন্দ্র করেই এই সমাজের মানুষের জাগতিক চিন্তা ভাবনা ধ্যান ধারনা গড়ে উঠেছে। কৃষির ওপর এই সমাজের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বলেই বছরের প্রথম দিনটা শুভাশুভ নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, বৃষ্টি ছাড়া কৃষি কাজ নিষ্ফল । আর তাই সবাই তাকিয়ে থাকে এই বছরের প্রথম দিনটির দিকে, যে দিনটি বৃষ্টি এবং অন্যান্য ইতিবাচক শুভ কর্মকান্ড দিয়ে শুভসূচনা হবে। “শুভ নববর্ষ” এই শুভ কামনারই দ্যোতক। শুধু কৃষকই নয় দেশের সবাই এই দিনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এবং সবাই বিশ্বাস করে যে বছরের প্রথম দিনের কর্মকান্ড এবং লক্ষণ সারা বছরকে প্রভাবিত করবে। এই জন্য তারা নানা আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরন করে নেয়। আর সেইসব উৎসব, আচারকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিশ্বাস-সংস্কারের স্পর্শের বাইরে নয় সেগুলোও।

গ্রামে দেখা যায় নববর্ষের আগের রাতে অর্থাৎ চৈত্র-সংক্রান্তির রাতে কৃষক পরিবারের গৃহিনীরা ‘আমানী’ প্রস্তুত করে রাখেন। ‘আমানী’ হচ্ছে একটি হাঁড়িতে পানি দিয়ে তার ভিতর আম আর কিছু চাল ভিজানো হয়, আর তার ভিতর রাখা হয় একটা পাতাসহ আমের ডাল। সকালে গৃহিনী বাড়ির সবাইকে হাঁড়ির ভেতরে রাখা ভেজা টক চাল খেতে দেয় আর আমের পাতা দিয়ে গায়ে হাঁড়ির পানি ছিটিয়ে দেন। বলা হয়ে থাকে এই পানি ছিটানোর অর্থ হল দেহ সারাদিন ঠান্ডা থাকবে। পানি ছিটানোর মধ্যে বৃষ্টির নকল আছে। আর চাওয়া তো সেটাই, বছরের প্রথাম দিন বৃষ্টি হোক, তবেই না সবাই ফসলের মুখ দেখবে। আর ভেজা টক চাল খাওয়া আর কিছু নয় স্বাস্থ্যবিধির দিক থেকে সুফলদায়ক। আর তা সারাবছর সুস্বাস্থ্য কামনার প্রকাশ। বৈশাখের পহেলা দিন ভোরে রাতে রান্না করা পান্তা খেয়ে মাঠে হাল চাষতে যায়। এতে বোঝা যায় তারা খুব অল্পেই তুষ্ট, তারা মোটা ভাত আর মোটা কাপড় পেলেই খুশি। কৃষকের সকালে পান্তা কাওয়ার পিছনে সারা বছর অন্নপ্রাপ্তির কামনাটাই প্রকাশ পায়ায়।

এসময় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন লোক খেলা, অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেমন টাঙ্গাইলে এ সময় দুটো খেলা হয়। একটির নাম ‘ভাড়া-ভুঁড়া’। পাটখড়ি জ্বালিয়ে এইদিন রাতে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। ভুত-প্রেত আর রোগ-বালাই দূর হবে বলে ওই এলাকার লোকের বিশ্বাস। আর একটার নাম হল ‘ঢোপবাড়ী’। যা হকি খেলার মতই। ড আশরাফ সিদ্দিকী মনে করেন, এই খেলার তাৎপর্য হলো, সামনের বিপদ-আপদ বা বাধা বিপত্তিকে এভাবে উত্তোরণ করা যাবে। রাজশাহীতে আয়োজন করা হয় ‘গম্ভীরা গানের।

এছাড়াও হালখাতা তো আছেই। অনেকেই মনে করে, পুণ্যাহ হালখাতা’রই সমপর্যায়ের, যদিও প্রথমটি নিয়ন্ত্রণ করেন জমিদাররা আর দ্বিতীয়টা ব্যবসায়ীরা। আজো পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা হালখাতা করে থাকেন এবং লেনদেনের ব্যাপারটা আনুষ্ঠানিক ভাবে মিটিয়ে ফেলেন।

(খ) নবান্নঃ

নবান্ন হয়ে থাকে সাধারনত অগ্রহায়ণ মাসে। এ উৎসব কৃষকের, কৃষির সঙ্গে যাদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে, তাদের। কোন কোন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে নিয়ে ঘরের চালে বেঁধে রাখে এবং বাকি অংশ চাল করে নতুন চালের পায়েস রান্না করে নবান্ন করে। আগে এ উপলক্ষে মুসলমান ঘরের মেয়েরাও লক্ষ্মীপূজা করত। কেননা পেশার সাথে লক্ষ্মীর সম্পর্কটা ঘনিষ্ট ছিল। তবে বর্তমানে ধর্মীয় কারনে মুসলিম পরিবারের মেয়েরা আর লক্ষ্মীপূজা করে না। নবান্নের একটি বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত শ্রী মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতার ‘বরিশালে নবান্ন’ নিবন্ধে। তার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, নবান্নের আগের রাতে ভোর না হতেই ছেলেমেয়েরা জেগে যেত এবং ঘরের বাইরে এসে সমস্বরে দাঁড়কাকদের নেমন্তন্য করত ছড়া কেটে-

কো কো কো, আমাগো বাড়ি শুভ নবান্ন।

শুভ নবান্ন খাবা কাকবলি লবা

পাতি কাউয়া লাথি খায়,

দাঁড় কাউয়া কলা খায়,

কো কো কো, মোর গো বাড়ি শুভ নবান্ন।

কাকবলির সাথে আরও তিনটা আনুষ্ঠানিক কাজ করা হত। আর সেগুলো হল লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ এবং বীরবাঁশ। বীরবাঁশ হল বাড়ির উঠোনের মাঝখানে গর্ত করে সেখানে কৈ মাছ ও দুধ দিয়ে একটা বাঁশ পোঁতা হত এবং বাঁশের কঞ্চিতে ধানের ছড়া বেঁধে দিত। এর সাথে সুইজারল্যান্ডের গৃহস্থ বাড়িতে বড়দিন উপলক্ষে পালন করা একটা অনুশঠানের মিল পাওয়া যায়। সেখানেও বড় বাঁশ পুঁতে তার কঞ্চিতে যবের ছড়া বেঁধে দেয়া হয়।

কাকবলির পর বাড়ির উঠোনে আসন পেতে সবাই মিলে নবান্ন ভোজের জন্য বসে এবং গৃহিনীরা থালায় ‘চাল মাখা’ ঢেলে তাতে বড় বড় নারকেলের নাড়ু ও ফোপড় সাজিয়ে সকলের আগে নিজ পরিবারের সবাইকে পরিবেশন করেন আর সেই সঙ্গে উলু ধ্বনি দিতে থাকে। এছাড়াও নবান্ন উপলক্ষে এই দিন প্রত্যেক পরিবারে অন্তত বিশ থেকে চল্লিশ রকমের রান্না হত। পরদিন সকালেও নবান্নের রেশ লেগে থাকত। একে বলা হত ‘বাস-নবান্ন’বা ‘বাসি- নবান্ন’।

(গ) পৌষ-পার্বণঃ

পৌষ পার্বণ মুলত পিঠার পর্ব। পর্বটি এখনো গ্রামীণ মানুষের জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আগে একে উপলক্ষ করে গ্রাম উৎসব মুখর হয়ে উঠত। এসময় মাগনের গান গাওয়া হত। পৌষ মাসের প্রতি রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ গান গেয়ে গ্রামের রাখাল ছেলেরা চাল সংগ্রহ করে মাঠ বা বনের ধারে বনভোজন করত। এছাড়াও প্রতি বছর যুবকেরা মিলে ‘সনারায়ের দল’ গঠন করে রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য ভিক্ষা করত। কেউ চাল দিত কেউ পয়সা দিত। দুই তিন হাত লম্বা কঞ্চিতে কাটা পাটের সুতা দিয়ে বেঁধে ‘সোনারায়ের’ প্রতীক তৈরী করা হত। আলাদা আলাদা দলের আলাদা আলাদা প্রতীক থাকে। ‘সোনারায়’কে সোনাপীরও বলা হত। কোন কোন অঞ্চলে আবার ‘জংলীপীর’ নামেও পরিচিত। সোনারায় এর মাধ্যমে পাওয়া পয়সা,চাল,তরকারি,মিষ্টি এনে মাঠ, নদীর ধারে বা বাগানে মহানন্দে ‘পোষলা’ করা হত। সোনারায় গাওয়া শেষে ঊভয় দলই বলত-

হোরবোল গাইতে গাইতে গলা হল ভারি,

মুসলমানে আল্লা বলে হিন্দু বলে হরি।

আবার বগুড়ায় মুসলিম বালকেরা মাগন গাইত মানিক ফকিরের নামে আর হিন্দু বালকেরা লক্ষ্মীর নামে। মুসলিমরা বলত-

ভিক্ষা মাগি কার নামে,

মানিকপীর সাহেবের নামে।

অপর দিকে হিন্দুরা বলত-

আলোরে অরণি, মা লক্ষ্মীর ধরণি।

মা লক্ষ্মী দিল বর ধান কড়ি বার কর।

ময়মনসিংহে পৌষ পার্বণ উপলক্ষে ‘বাঘাইর বয়াত’ নামক এক প্রকার কবিতা আবৃতি করা হত।

(ঘ) গাস্বীঃ

গাস্বী মুলত কৃষি উৎসব। আশ্বিন সংক্রান্তিতে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এ উৎসব পালন করে।

আশ্বিনে রাধে কার্তিকে খায়,

যে বর মাগে সে বর পায়।

এই বিশ্বাসে গ্রামের প্রতিটা মানুষ এই অনুষ্ঠানে কোন না কোন ভাবে নিজেকে যুক্ত করে। কবি জসীমউদ্দিন গাস্বী সম্পর্কে তার ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বর্নণা করে বলেছেন-”আমরা ছেলেবেলায় সারা বৎসর এই গাস্বীর দিনটির প্রতি তাকিয়া থাকিতাম। সারাদিন এ বন ও বন ঘুরিয়া তেলাকুচের পাতা,আমগুরুজের লতা, হলদী, পানের গাছ, মেথি, বড় কচুর পাতা প্রভৃতি সংগ্রহ করিতাম। তাহার পর উঠানের এক জায়গা ভালমত লেপিয়া সারাদিনের কুড়ান সামগ্রীসহ তালের আটি ও নারিকেল, পান সুপারি, সুন্দা মেথি, কাজল তুলিবার জন্য কলার ডাটা প্রভৃতি একটি বড় কচুর পাতার উপর আর একটি কচু পাতা দিয়ে ঢাকিয়া রাখিতাম। শেষ রাত্রি উঠিয়া আগুন জ্বালাইয়া আগুনের চারিদিকে ঘুরিয়া মশা তাড়ানোর মন্ত্র পরিতাম……

যা যা মশা মাছি উইড়া যা

আমাগো বাড়িত্যে অমুকের বাড়ি যা।

গাস্বী রাত্রে যে গাছে ফল ধরে না একটা কুড়াল লইয়া দু একটা কোপ দিতাম আর বলিতাম “এই গাছে ফল ধরে না এই গাছ আজ কাটিয়াই ফেলিব।’ আর একজন যাইয়া বলিত ‘না না কাটিস না। এ বছর ধরিবে।’ তখন নিরস্ত হইতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল ঐরুপ করিলে গাছে ফল ধরিবে। গাস্বীর রাত্রে যাহারা মন্ত্র তন্ত্র জানতো তাহারা সারারাত জাগিয়া সেই মন্ত্র তন্ত্র আওড়াইতো। তাহাদের বিশ্বাস ছিল এরুপ করিলে সেই তন্ত্র মন্ত্র ফলদায়ক হইবে। অনেকের বাড়িতে সারারাত গান হইত। আস্তে আস্তে ভোরের আকাশ রঙ্গিন করিয়া সূর্য উঠিত। আমরা তখন সেই সুন্দ্রা মেথি, আম-গুরুজের লতা, তেলাকুচের পাতা ও হলদী পাটায় বাটিয়া সারা গায়ে মাখিয়া নদীতে স্নান করিতে যাইতাম। ফিরিয়া আসিতে কলার ডাঁটার কাজল করিয়া মা আমাদের চোখে পরাইয়া দিতেন। তারপর তালের শাঁস, নারিকেল, গুড় আর চিড়ামুড়িসহ অপুর্ব নাস্তা করিয়া পাড়ায় বেড়াইতে যাইতাম। নইমদ্দি মোল্লার বাড়িতে হালটে কুস্তি ও হাডুডু খেলা হইত। নদীর ওপর চরে লাঠিখেলা হইত। তাহা দেখিয়া দুপুরে বারি ফিরিতাম। বাড়িতে সেদিন ভাল খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হইত। গাস্বীর পরদিন বড়রা বিলে ঝিলে পলো লইয়া মাছ ধরিতে যাইত। গাছিরা অন্তত একটি খেজুর গাছর ডগা কাটিয়া ভবিষ্যতে রস বাহির করার ব্যবস্থা করিত। “

লেখকঃ নিয়াজ আহম্মেদ
লেখক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here