বাংলা সংস্কৃতির কিছু অমীমাংসিত বিষয়

0
13

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
বাঙালির সবকিছুই বাঙালির সংস্কৃতি। এখানে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন আসে কেন? একজন জার্মানকে কি প্রশ্ন করা যাবে আপনি কি জার্মান? প্রশ্ন করলে সে বরং আশ্চর্যই হবে। সে অবশ্যই বলবে যে আমি যতদিন ধরে আছি, ততদিন ধরেই তো জার্মান? একজন ইংরেজকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি কি ইংরেজ? আপনি কিসে ইংরেজ? আসলে এসব অবান্তর প্রশ্ন। তাহলে আমাদের বেলাতে এ প্রশ্ন উঠছে কেন? প্রশ্ন উঠছে, কারণ আমাদের কাজকর্ম নেই, করতেও চাই না, অবান্তরের মধ্যেই ডুবে আছি। আমরা আমাদের ভাগ করে ফেলেছি, বাঙালি আর বাংলাদেশি। এখন যদি বলা হয় বাঙালির কোনটুকু বাদ দিয়ে বাংলাদেশি, আর বাংলাদেশিটুকু বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই বা কি- এই প্রশ্ন কেউ করে না, কারণ এর উত্তর নেই। তার মানে এটা প্রশ্নই নয়।

বাঙালি সংস্কৃতির গঠনটাকে প্রথমে দেখতে হবে। সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায় সেটাও দেখতে হবে। এ বিষয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে। ড. গোলাম মুরশিদ একটি বই লিখেছেন, ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’। বইটি যখন প্রকাশিত হলো, তখন তা নানা জায়গায় আলোচিত হয়েছিল। একটা আলোচনা মনে আছে, করেছিলেন সনৎকুমার সাহা। তিনি বলেছিলেন, পর্দা উন্মোচিত হলে যে মঞ্চটা আমাদের চোখে পড়ে, সেইটাই কি সব? তাহলে নবম-দশম শতাব্দী থেকে যে পর্দার উন্মোচন ঘটেছে, তার পেছনে কি কিছু নেই? আমরা বলি যে বাংলা ভাষার সঙ্গেই বাঙালি সংস্কৃতির সূচনা। এই অর্থে বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো। এটা আমরা মোটামুটি মেনে নিয়েছি। তবু ধারণাটি পরিষ্কার নয়, সম্পূর্ণও নয়। একটার পর একটা প্রশ্ন এরপর করা যায়। সংস্কৃতির ঊষাকালের কথায় আমরা বলেছি, চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। এই তর্কটাকে আমি বাদ দিয়ে দিচ্ছি, কেউ বলছেন অষ্টম শতাব্দীর শেষে, কেউ বলছেন দশম শতাব্দীতে। নানা রকম কথাই আছে। পরে যারা এই বিষয় নিয়ে আরো গবেষণা করবেন, ভাববেন, পাথুরে প্রমাণ বের করার চেষ্টা করবেন, তাদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। হাজার বছরের যে ইতিহাসটা তুলে ধরতে চাইছি সেই ইতিহাসটার পিছনেও আরো কিছু অবশ্যই আছে, যা উন্মোচিত হয়নি।

জাতিত্বের কথাও ছলনাময় প্রসঙ্গ বটে। বাঙালি জাতির উদ্ভব কবে? সরাসরি কোনো জবাব নেই। আমরা হাজার বছর পিছিয়ে গিয়ে ইতিহাসের একটা খুঁট ধরলাম মাত্র। আরো কি হাজার বছর পিছিয়ে যাওয়া যায়? আর পিছিয়ে গেলে কি আরো অনেক শতাব্দীর ইতিহাসের উপস্থিতি কি মিলতে পারে? এই জাতি গঠনের ক্ষেত্রে, এই ভাষা গঠনের ক্ষেত্রে? বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন ঠিক কোনো সাহিত্যিক রচনা নয়, কাব্যও নয়, গদ্যও নয়। মূলত সেগুলো রচিত হয়েছে বৌদ্ধ সহজিয়া মতের গভীর উপলব্ধি থেকে। যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সমাজের উচ্চ কিংবা মধ্য শ্রেণীর মানুষ নন। একেবারেই দারিদ্র্য-জর্জরিত অন্তেবাসী, ব্রাত্য শ্রেণীতেই তাঁদের অবস্থান। ভূখণ্ডের মূল বাসিন্দাদেরই অন্তর্ভুক্ত তাঁরা। শবরী, ডোম ইত্যাদি নিম্নবর্গের মানুষদের পৌনঃপুনিক উল্লেখ পাওয়া যায়। দোহা বলা হয়েছে এদের। নানা রাগরাগিণী ও তালের উল্লেখ থেকে মনে হয় এগুলো গীত হতো। এই গানগুলো যাঁরা রচনা করেছিলেন, তাঁদের থেকেই যদি আমি বাঙালি সংস্কৃতির সূত্রপাত ধরতে চাই, তাহলে বোধ হয় মূলে পৌঁছুনো যাবে। তাহলে সমাজের অন্তেবাসী যাঁরা তাঁদের হাতেই বাংলা ভাষার প্রথম নির্মাণ। পুরো সমাজটার প্রতিনিধিত্ব তাঁরা নিশ্চয়ই করছেন না এবং ঐ চর্যাপদের পর থেকে মোটামুটি দুশো বছর ধরে আর বাংলা ভাষার কোনো নিদর্শনের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। অন্তত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জয়দেব হয়তো বাঙালি, কিন্তু তাঁর অতুলনীয় কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’ বাংলা ভাষায় লেখা নয়। বাংলার বেশ কাছাকাছি নিয়ে আসা সংস্কৃত ভাষায়। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ এই দুই শতককে নিষ্ফলা শতক বলা হয়েছে, অন্ধকার শতক বলা হয়েছে, বাংলা ভাষার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি বলে। তাহলে আমরা যে খণ্ডটুকু পাচ্ছি, যেটাকে অবলম্বন করে আমরা সমাজ ও সংস্কৃতির গঠন সম্পর্কে ধারণা করতে চাইছি, তাতে অজস্র ফাঁকফোকর থেকে যাচ্ছে। এই ফাঁকফোকরগুলো যদি বের করতে পারা যায়, তাহলে বাঙালি সংস্কৃতির আদিতম চেহারাটার একটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে। চর্যাপদের যুগে সমাজটা কেমন ছিল? ভাষার কথাটা যদি তুলি, তাহলে মুখে বলা আর সাহিত্যচর্চার ভাষাটা কি একই রকম ছিল? বাংলা ভাষার খবর পাওয়া যাক বা না যাক, চালু ভাষাগুলির চর্চা তো নিশ্চয়ই ছিল। ক্ষেত্রবাবু বলছেন, নিশ্চয়ই চর্চা বন্ধ ছিল না। সংস্কৃত ভাষা ছিল। সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য চর্চা চলেছে। শিল্প-সাহিত্য চর্চা নিশ্চয়ই কিছু কিছু হয়েছে। এসব প্রশ্ন আজকের উত্তরাধিকার সূত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসনের সূচনা থেকে পরবর্তী একটা অধ্যায় শুরু হয়। মুসলিম শাসন প্রায় ছয়শো বছর চলেছে। এই ছয়শো বছরের মধ্যে একশো-দেড়শো বছর ধরে বাংলা ভাষার কোনো রচনা পাওয়া যায় না। চতুর্দশ, পঞ্চদশ শতক প্রায় পার হয়ে গেলো। পঞ্চদশ শতকের শেষে এসে মোটামুটিভাবে আবার বাংলা ভাষার চর্চা দেখা যাচ্ছে। তাই এই সময়টার সমাজ গঠনটা আমাদের বিশেষভাবে ভাববার বিষয় আছে। আমার মনে হয় বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নটাকে একটা সরল সাদাসিধে অনুমানের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলে আসল জায়গায় পৌঁছানো যায় না। সমাজগঠন, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি সমস্ত কিছু জড়িয়ে আছে বলেই প্রশ্নটা জটিল আকার ধরে।

পরবর্তী অধ্যায় আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে ব্রিটিশ শাসন। আমরা এটাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলছি। আজকের বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গেলে এই দুশো বছরের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির কথাই প্রধান হয়ে ওঠে।

মনে হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের মতো এমন একটি বারোয়ারি বিষয়কে টেনে বাঁধা একটা সড়কে এনে ফেলা গেছে। ভাগ করা হলো তিনটি: প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক। আর একটা ভাগ হবে সাম্প্রতিক। ইচ্ছে হলে ভাগের ভাগ, আরো ভাগ করা যেতে পারে- প্রাচীনের আদি আর অন্ত্য। মুসলিম শাসনের দিল্লির সুলতানি আমল আর স্বাধীন সুলতানি আমল। তারপর মুঘল আমল, কোম্পানি আমল, সাম্রাজ্যিক আমল। ভাগের পর ভাগ করতে অসুবিধা কিছু নেই। তবে মুশকিল হচ্ছে, এতো করেও শেষ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। উত্তরাধিকারের প্রায় কিছুই বোঝানো যাবে না। বিশাল এক জাহাজ হাজার রকমারি জিনিশে পরিপূর্ণ হয়ে দিকহীন সময়-সমুদ্রে ভেসে চলেছে। কোথায় ভিড়বে তার লক্ষ্য স্থির নেই। এতো দ্রব্য, কিন্তু মোটেই থরে থরে সাজানো নয়। কে কার মধ্যে ঢুকে আছে, বলা কঠিন। সাদৃশ্যে-সাদৃশ্যে, বৈসাদৃশ্যে-সাদৃশ্যে, হিতে-বিপরীতে, সহজে-কঠিনে মিশে গেছে। এই হচ্ছে সংস্কৃতি। একে বাঁধা পথে এনে লাভ কিছু নেই।
তবে যতো পিছনের দিকে যেতে চাই, ততো আলো কিন্তু কমে আসবে। চেনা জিনিস আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে উঠবে, জীবনের কলরব ধীরে ধীরে নীরব হতে থাকবে। ঘরবাড়ি, মানুষজন ক্রমেই অস্পষ্ট আবছায়ার মধ্যে ঢুকে পড়বে। মৃতের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। হয়তো ঘরবাড়ি, পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, প্রথা-অভ্যাস, সংস্কার- এক কথায় জীবনযাপন অচেনা, অজানা, অস্পষ্ট হতে হতে যখন পুরোপুরি অপরিচয়ের মধ্যে তলিয়ে যাবে, সেখানেই আমাদের থামতে হবে। আর ঠিক সেখানেই সংস্কৃতির যাত্রাবিন্দুটি নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। ঐ যাত্রাবিন্দুটিই প্রথম ধাপ। বাঙালি সংস্কৃতিকে যুক্তিসিদ্ধভাবে অষ্টম-নবম-দশম শতাব্দী পর্যন্ত আমরা পিছিয়ে নিতে পেরেছি। আমরা মনে রাখি যে, সেই শুরুর ধাপের পর আমরা যতো ধাপ একটির পর একটি পেরিয়ে যাই না কেন, একেবারে স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন, আলাদা নয় কেউ। একটি থেকেই আর একটি। যোগাযোগগুলো শুধু খুঁজে নেবার অপেক্ষা। বড়ো একটা পথের মোড়ের মতো, প্রবাহের এক-একটি বাঁকের মতো।

তবে ইতিহাসই আমাদের শেখায় যে, অছিন্নতারও ছেদ কখনো কখনো ঘটে, এক কাল আর এক কালে গিয়ে পৌঁছায়। প্রায় দ্বিখণ্ড, মাঝখানের সেতুবন্ধনকে খুঁজে পাওয়া একেবারে অসাধ্য না হলেও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বলতে হয়, সময়ের জোড়গুলি আলগা হয়ে গেছে, খুলে গেছে।

আদি বাংলাদেশের জায়গা থেকে হর্ষবর্ধন ও শশাঙ্কের আংশিক শাসনকাল ইতিহাসের চোখে ধূসর; তাহলে ঐ বাংলাদেশেরই জায়গা থেকে পাল-সেন বংশের শাসনকে বৌদ্ধ-হিন্দু শাসন বলতে চাইলে হয়তো বলা যায়, একই সঙ্গে তাকে বিদেশি শাসন বলা চলে কি? অবশ্য ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসনকে স্পষ্টতই বিদেশি বলা চলে। এসব বিবেচনা এখন অবান্তর হয়ে গেছে। ভাষা, সংস্কৃতি, নৃ-পরিচয়, সময়ের মহাঘানিতে পেষাই হয়ে একাকার হয়ে গেছে। নিরবচ্ছিন্নতার কথাটা এইজন্যেই খুব বড়ো হয়ে আমাদের কাছে দেখা দিয়েছে। তারপরও হিশেব করে দেখছি, বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম শাসনের মোট আটশো বছরের ছশো বছর কেটে গেছে মুসলিম শাসনে। এর মধ্যে কতো যুদ্ধ, কতো বিপ্লব-উপপ্লব, বিদ্রোহ, হত্যা, গুপ্তহত্যা, রক্তপাত ঘটে গেছে। অবিচ্ছিন্নতার মূল সুতোটা কখনো ছিঁড়ে যায়নি। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির এই গৌরব ও অহংকারের ঐক্যসূত্র অটুট থাকার একটি বড়ো কারণ হচ্ছে, পরিবর্তন, অস্ত্রের ঝনঝনানি, দখল, দাপট―যা কিছু ঘটেছে, সব শাসকদের মধ্যেই, সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামো, উৎপাদনের উপায়-উপকরণ, জীবনযাপনের ব্যয়-বণ্টনের বেলায় পরিবর্তন শত শত বছরের মধ্যে কখনো মূলের দিকে যায়নি। এ এমন এক স্রোত, যেখানে উত্তাল ঢেউ ওঠেনি, প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে পুরো ভূখণ্ড প্লাবিত হয়নি, ভূমিকম্পে সমাজ-রাষ্ট্র ধসে পড়েনি। মুঘল আমলের আগে গোটা বাংলার বাস্তবতাটাও নির্দিষ্ট হয়নি। প্রায় আধা ঘুমন্ত, একঘেয়ে, অলস-মন্থর, উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন এক দেশ-সমাজপট বিদ্যমান ছিল। না, না, আমার এই হঠকারী তথ্য-অসমর্থিত বেমক্কা রায়টার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় ব্যস্ত হবার প্রয়োজন নেই। আমি বাঙালির সৃজনশীলতা মানি, মানবিক প্রতিভা মানি, আমার অস্তিত্বের ঋণ স্বীকার করি; মধুর মানবিক গভীর সাহিত্য, শিল্প, লোকধর্ম, লোকযাত্রা, লোকশিল্প, মন্দির, মসজিদ, মূর্তিশিল্প, অগণ্য নারী-পুরুষের অনুপম হস্তশিল্প, কোনো কিছুই অস্বীকার করি না। এ সবেরই প্রাণবন্ত উপস্থিতি চাই আমাদের বর্তমানে। আরো, শিল্প-সাহিত্যে, লোকভাবনায়, ধর্মে-সংস্কৃতিতে, উপপ্লবগুলিও জানি, যে বন্যায় নবদ্বীপ ডুবুডুবু, নদে ভেসে যায়, তার খবর অমর বঙ্গবাসীরা চিরকালই জানবে।

কথাটা ঠিক ওখানে নয়, আমি কথাটাকে নিয়ে যেতে চাইছি আরো অনেকটা তলায়, সমাজ-রাষ্ট্রের একেবারে ভিত্তিতে। তাতে মনে হবে, শব্দ করেই যোগসূত্র ছিঁড়ে গেছে ১৭৫৭ সালে। শেষ অপরাহ্ণে মুমূর্ষু আলো এসে পড়েছে সমাজ-রাষ্ট্রের গায়ে। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরেই যাদের হাতে বৃহৎ বাংলা- সুবে বাংলা- বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার অধিকার ও শাসনক্ষমতা এসে পড়লো, সে একটা বিদেশি বেনিয়া কোম্পানি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই শাসন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক শাসনের ভিতর দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনে পরিণত হয়ে গোটা ভারতবর্ষে টিকে রইলো প্রায় দুশো বছর। মোটামুটি আটশো বছরের বাংলাদেশের সুবিশাল ও সুবিস্তৃত পটভূমিতে ব্রিটিশ শাসনের দুশো বছরের বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েই আমি ছেদের কথা বলেছি, ঐক্যসূত্র ছিঁড়ে পড়ার কথা বলেছি, ইতিহাস আর সময়ের জোর খুলে যাওয়ার কথা বলতে চেয়েছি। কারণ এই বদলটা আর মাথার উপর চেপে বসা শাসকদের বদল নয়- এই বদল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভাবগত, চিন্তাগত, প্রায় বিশ্ব-সমীকৃত রাষ্ট্রভাবনা, আর্থসামাজিক কাঠামোগত ভাবনা, প্রবল পশ্চিমের মনন-চিন্তনের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা। এইটাই হচ্ছে অতীতকে ছিঁড়ে আলাদা করে ফেলা, নতুন পৃথিবীতে ঢুকে পড়া, নো-ম্যান্সল্যান্ড পার হয়ে এসে ভিন্নতর বাস্তবতায় পা ফেলা। দুশো বছরের এই বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-মনন-সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা আসলে আর এক জটিল বাস্তবতায় প্রবেশ করা। বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের কথায় একে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, তাতে অঙ্গহানি হতে হতে হৃদয়-মস্তিষ্কের মতো অঙ্গও বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখকঃ হাসান আজিজুল হক
সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here