চাকমা উপজাতির সমাজ ও সংস্কৃতি

0
24

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলতে যা বোঝায় তা অবলোকন করার একমাত্র স্থান হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখানে সৌন্দর্য সৃষ্টির অপার মহিমা প্রকৃতি অর্থাৎ বনবনানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার উপজাতি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থাৎ তাদের সমাজ, সংস্কৃতির মধ্যেও তা প্রস্ফুটিত হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে আইডিএফ নামের একটি এনজিও সংস্থায় কাজ করার সুযোগে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। শুধু প্রাকৃতিক সুশোভামণ্ডিত সৌন্দর্য উপভোগ করেই নয়, সেখানকার ১১টি উপজাতি জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি কাছে থেকে দেখা, উপভোগ করার সুযোগও পেয়েছি। সেই তখন থেকেই আমাদের ঐতিহ্যময় সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা হৃদয়ে পোষণ করেছিলাম। কিন্তু সময়াভাবে তা খেলা হয় উঠেনি। আজ আমি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ চাকমা উপজাতির নামকরণ উৎপত্তি, সমাজ ও সংস্কৃতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে কিছু লেখার চেষ্টা করছি মাত্র। চাকমা উপজাতি হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি জনগোষ্ঠী। রাঙামাটি জেলায় তাদের বসবাস বেশি। তবে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কিছু কিছু চাকমা উপজাতি পরিবার দেখা যায়। নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে চাকমারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। স্যার রিজুলী (১৮৮১) এর মতে চাকমাদের দেহে ৮৪.৫% ভাগ মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাদের গায়ের রং সুন্দর এবং ফর্সা, মুখমণ্ডল গোলাকার, ওষ্ঠাধার পাতলা, চুলগুলো সোজা, চোখের মণি ও চুলের রং কালো, দাড়ি-গোঁফ কর্ম, দেহ প্রায় কেশহীন; পুরুষদের উচ্চতা মাঝারি গোছের; গড়ে র্৫-র্৬র্ আর স্ত্রী লোকদের উচ্চতা গড়ে র্৫-র্৪র্ ।
চাকমা সমাজের প্রধান হলেন চাকমা রাজা। অতীতে চাকমা রাজারা ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্বকালীন সময়ে ধামেই, চেগে, খীসা প্রভৃতি পদাধিকারী ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাকমা সমাজের উপর তাদের রাজত্ব করতেন। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রথমোক্ত দু’টি পদলোপ পেয়ে তদস্থলে ‘দেবান’ পদে সৃষ্টি করা হয়। রানী কালিঙ্গীর রাজত্বকালে তিনি ‘দেওয়ান’ পদের পরিবর্তে ‘তালুকদার’ পদের প্রচলনের চেষ্টা করেন। তাঁর তালুকদারেরা ভূমির তালুকের পরিবর্তে কতগুলো মনুষ্য তালুকের উপর ‘তালুকদার’ পদের অধিকারী হল; কিন্তু ঐ সময় ইংরেজরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে কতকগুলো মৌজায় বিভক্ত করে প্রত্যেক মৌজায় একজন করে হেডম্যান নিয়োগ দান করা শুরু করলে রানী কালিন্দী কর্তৃক প্রবর্তিত তালুকদার প্রথা বাতিল হয়ে যায়। হেডম্যানরা স্ব স্ব মৌজার উপর কর্তৃত্ব লাভ করেন। প্রত্যেক মৌজায় অবস্থিত প্রত্যেক গ্রামে গ্রামবাসীরা একজন করে কার্বারী নির্বাচিত করে। এর ফলে চাকমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামো ‘রাজা-হেডম্যান-কার্বারীরূপ ধারণ করে।

জীবিকা : তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় হল ঝুম চাষ। এটা একটা অদ্ভূত পদ্ধতির কৃষি কার্য যা গবাদি পশু বা লাঙ্গলের ব্যবহার ছাড়াই পাহাড়ের উপর ঢালুতে করা হয়। ‘দা’ হল তাদের প্রধান অস্ত্র। এর সাহায্যে তারা জঙ্গল কেটে এক মাসের মত রৌদ্রে শুকানোর জন্য রেখে দেন। তারপর এপ্রিলের প্রথম পক্ষকালে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর গাছের গুঁড়ি ও মাটির নিচে শিকড়-বাকড় উপড়িয়ে ফেলে ঝুম পরিষ্কার করা হয় এবং বৃষ্টি হওয়ার পর ধান, তুলা, শসা, তিল, ভুট্টা প্রভৃতির বীজ একটা ঝুড়িতে নিয়ে একত্রিত করে জমিতে দা’য়ের সাহায্যে ছোট ছোট গর্ত করে তাতে ঐ মিশ্রিত বীজ কিছু কিছু অংশে ভাগ করে তাতে ফেলা হয়। তবে যখন সমতল ভূমি পাওয়া যায়, পাহাড়িরা তখন ষাঁড় ও মহিষ দিয়ে ‘লাঙল চাষ’ ও করে থাকে। এই কৃষি পদ্ধতি তারা সমতল ভূমির লোকদের কাছ থেকে শিখেছে। ফসল কাটার প্রধান কারিগরি অস্ত্র হল কাস্তে। তবে বর্তমানে জীবিকা নির্বাহরে জন্য একমাত্র ঝুমচাষই অবলম্বন নয়, এখন তাদের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা শুরু হয়েছে অনেকেই শিক্ষকতা ও অফিস-আদালতে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহের পথকে প্রশস্ত করেছে।

ঘর : তাদের ঘরগুলো সম্পূর্ণ বাঁশের তৈরি এবং এগুলো বাঁশ বা কাঠের খুঁটির সাহায্যে মাটি হতে ৪ থেকে ৬ ফুট উঁচু হয়। মেঝে ও দেয়াল বাঁশ চিরে করা হয় এবং ছাদ ছন ঘাস, বাঁশের পাতা, করুক পাতা (এক ধরনের পাহাড়িয়া পাতা) প্রভৃতি দিয়ে ছাওয়া হয়। ‘পিজারের দুই পাশে দুটো কাঠের মই থাকে; আঙ্গিনার মত খানিকটা খোলা জায়গা ঘরের সামনে থাকে। একটা মই উঠে গেছে ব্যক্তিগত কক্ষ বা পিজারের দিকে এবং অপরটি চানা (বারান্দা) ও সিংকারা বা অতিথি কক্ষের দিকে। এই অতিথি কামরা প্রত্যেক বাড়িতেই দেখা যায়। এটা হল উপজাতিদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং এতেই তাদের আতিথেয়তার পরিচয় পাওয়া যায়। ঘরের ভিতর প্রবেশের পূর্বে প্রত্যেকেই মইয়ের কাছে রক্ষিত জলপাত্র থেকে জল নিয়ে পা ধুয়ে নেয়। ঘরের নীচে (অর্থাৎ মাচানের নীচে) খোলা জায়গায় গৃহপালিত পাখি, শুকর, ছাগল প্রভৃতি রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ধর্ম : তারা সকলেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তবুও অনেকেই আবার আদিম প্রকৃতি পূজার কোন কোন আচার-আচরণ পালন করে থাকে।
রীতি-নীতি : প্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ে তাদের মধ্যে বিদ্যমান। যদিও বহু-বিবাহ অনুমোদিত তবুও এর দৃষ্টান্ত বিরল। বিধবারা পুনরায় বিয়ে করতে পারে। নানা কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে। যেমন : স্ত্রীর ব্যভিচার, সংসার কর্মে অবহেলা, সংক্রামক রোগ প্রভৃতির কারণে স্বামী এবং স্বামীর নিষ্ঠুরতা, সংক্রমণ ও অনারোগ্য ব্যাধি, পুরুষত্বহীনতা প্রভৃত্তির কারণে স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। যৌতুক বা ‘ডাফা’ দেওয়ার প্রথা আছে। বরের বাবা কনের বাবা বা অভিভাবককে যৌতুক দেয়-অবশ্য অবস্থানসুারে তারতম্যও হয়।
গোপনে পলায়ন : যদিও বিয়ের ব্যাপারে মাতা-পিতার সম্মতির দরকার হয় তবুও মাতা-পিতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেমেয়ে গোপনে বিয়ে করতে পারে। এক সময় সমাজ তা মেনে নেয়।

বিবাহ : চুমুলাং ও জারগেট (বিবাহ গিট) বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথমে জারগেট বন্ধন দেওয়া হয়। বর-কনে পাশাপাশি বসে। কনে বরের বাম পাশে বসে। তারপর ঠাট্টা-তামাশা করতে পারে এমন সম্পর্কের ১ জন পুরুষ ও ১ জন স্ত্রী লোক এসে তাদের (বর ও কনে) কোমরে একটি কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। এটাকেই ‘বিবাহ গিট’ বলে। বিবাহ গিট দেওয়ার পূর্বে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়। এই প্রথা স্মরণাতীত কাল থেকে চল আসছে। এর তাৎপর্য এই রূপ সমাজের সদস্য হিসাবে উপস্থিত ব্যক্তিদের অনুমিত দেয়া। এ বিয়েতে কারও আপত্তি থাকলে, সেটা বলার সুযোগ দেওয়া।
কথিত আছে যে, বিবাহ গিট দেওয়ার পর যে আগে উঠে দাঁড়াবে সে অপরের উপর কর্তৃত্ব করবে। তারপর বর ও কনে তাদের মুরুব্বীদের কাছে যায়। গুরুজনেরা ধান (খাদ্যের প্রতীক), দূর্বা (সাফল্যের প্রতীক) ও তুলা (কাপড়ের প্রতীক) দিয়ে তাদের আশীর্বাদ করে। জারগেট হয়ে যাবার পর বা পরের দিন চুমুলাং পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পরমেশ্বর ও পরমেশ্বরী হল তাদের বিয়ের দেব-দেবী।
জারগেট ও চুমুলাং এই উভয় অনুষ্ঠান গ্রাম্য পুরোহিত ‘ওঝা’ পরিচালনা করে থাকে।

উৎসব : ‘বিজু’ (নববর্ষ) ও সর্দারের ‘পানাহা’ হল প্রধান উৎসব। অবশ্য ভাল ফসল, সম্প্রদায়ের সার্বজনীন মঙ্গল, অসুখ-বিসুখের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ইত্যাদির জন্য তারা পূজা-অর্চনা করে থাকে।

সঙ্গীত : প্রধান বাদ্যযন্ত্র হল বাঁশের বাঁশি। সব তরুণই এই বাঁশি বাজায়। ‘খানগারাং’ হল বাঁশের তৈরি জটিল ধরনের যন্ত্র যা মেয়েরাই বাজায়। প্রধান মহাকাব্য ধর্মী কবিতার অন্যতম হল ‘চাটিগা চারা’ (যে গানের মাধ্যমে চাকমাররা কেমন করে চট্টগ্রামে এলো তা বলা হয়, আরেকটি হলো উপকথার ‘তানাবী’- এটাতে তানাবীর রূপ ও লাবণ্যের পুঙ্খাপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা অনেক বিরহীর মনকে নাড়া দিয়ে যায়। গৃহকর্ত্রীদের সুরেলা ছোট ছোট ঘুমপাড়ানি গান ও কম উল্লেখযোগ্য নয়। আর একটি ধর্মীয় দীর্ঘ গান আছে, তাকে বলা হয় ‘গজেনা লামা’। গজেন বা গোসাই অর্থ হল সর্বশক্তিমান। এছাড়া অন্যরকম গানও আছে, যেমন: ‘উডাগীত’ (তারুণ্যের গান), যা সব যুবকই গেয়ে থাকে। চাকমাদের ভিতর ‘গানকুলি’ বা গায়ক দল দেখা যায়, তারা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মহাকাব্যের খণ্ড খণ্ড অংশ, প্রেমের গান ও ঐতিহাসিক গান গেয়ে থাকে। সর্বত্রই তারা সাদরে অভ্যর্থিত হয়ে থাকে। দিনের শেষে নির্মল শীতের রাতে ‘গানকুলি’ আগুনের পাশে বসে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বাঁশিতে ফু-দিয়ে সুর তুলে এক কাব্যিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। তার চারপাশে বসে থাকে গ্রামের লোকজন। বয়স্করা হুঁকা টানে এবং গানের তালে তালে মাথা দোলায়। ছেলেমেয়েরা গানের ধুয়া ধরে এবং পরিবেশটা জমজমাট করে তোলে।

খেলাধুলা : হা-ডা-ডু খেলা, ফারেখেলা, লাটিম খেলা, কুস্তি রশি টানা, সাঁতার, দেীঁড় প্রতিযোগিতা প্রভৃতি ছেলেদের প্রিয়খেলা এবং পাটিখেলা, গিলা খেলা (একরকম সুপারী জাতীয় ফল দিয়ে খেলা) প্রভৃতি মেয়েদের প্রিয় খেলা।
পোশাক : মেয়েরা লম্বা চুল রাখে। পুরুষেরা ধুতি, গামছাকানী, ঘরে বোনা কোট ও মাঝে মাঝে মাথায় পাহাড়ি বা খাবাং পরিধান করে থাকে। মেয়েরা ‘পিনান’ (স্কার্ট) ‘খাদি’ (বক্ষ-বন্ধনী) ও কাবাং পরে থাকে। অবশ্য মাঝে মাঝে শাড়ি-ব্লাউজও পরে। ‘পিনান’ হল ঘরে বোনা উপরের ও নীচে লাল ডোরা কাটা এবং এক ধারে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ‘চাবুকী’ নামে পরিচিত ফুলের সুচিকর্ম করা ঘাগরা বা স্কার্ট বিশেষ। এটা কোমর থেকে পায়ের গিট পর্যন্ত জড়িয়ে পরা হয় এবং এর নীচের দিকে খোলা থাকে। ‘খাদি’ হল ২ ফুট চওড়া ও ৬ ফুট লম্বা রঙিন নকশা করা একটুকরা সুন্দর বোনা কাপড় যা বক্ষ বেক্ষণ করে পরা হয়। তিন রকম ‘খাদি’ আছে : (১) চিবু ট্টানা হল সাধারণ খাদি-এটা বৃদ্ধদের জন্য, (২) ফুলখাদি সাধারণত মধ্য বয়স্কা স্ত্রীলোকদের জন্য এবং (৩) রাঙা খাদি যুবর্তী বা অল্প বয়সের মেয়েদের জন্য।

যে সমস্ত কাজকর্ম মেয়েরা করে থাকে :
বয়ন কাজ : এটা চাকমা মেয়েদের একটি অতি প্রয়োজনীয় গুণ এবং যখন কোন মেয়েকে পছন্দ করা হয় তখন তার এই বিশেষ গুণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের জটিল ও ব্যাপক কারুকার্য খচিত বস্ত্রকে বলা হয় ‘আলম’। একে মিশরের সুবিখ্যাত কারুকার্যময় বস্ত্রাদির সঙ্গে তুলনা করা যায়। এটা হৃদয়গ্রাহী শিল্পকলাও বটে। কতকগুলো নমুনার নাম হল ‘বেগুনবিচি’, গাছ ছাবাং-পাডী ছাবাং, বাঘা চোখ প্রভৃতি। ‘বন’ বা হস্তচালিত তাঁতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হল তাগালক, তাপসী, চাম ও তার জড়ি, তারাম, সুচাক বাচ, বত্তেকাদী, তামুর কাচ, বা আং, খুরচুমা, কুদুক-কাদাক বা চিবাং, সিয়াং প্রভৃতি। সব রকম কাপড় এই ‘বেনে’ বোনা হয়।
সুতাকাটা : মেয়েরা প্রথমে চরকীর সাহায্যে তুলার বীজ ফেলে দেয়, তারপর ‘ধানু’ বা ‘ধুনুনি’র সাহায্যে তুলাকে নমর, ঢিলা ও স্ফীত করা হয়। এরপর ‘পেচ’ নামে পরিচিত একটি দণ্ডে তা জড়ানো হয়। তারপর চাকার সাহায্যে সুতা কাটা হয়।
রং করা : তারা দেশীয় কায়দায় সুতার রং করে। নীল বা কালো রং তৈরি করার জন্য ‘কামলা’ বা ‘নীল’ গাছের পাতা একটি জলপূর্ণ মাটির পাত্রে দুইদিন ভিজিয়ে রাখা হয়। কালো রং পেতে হলে ‘কালাগাব’ গাছের ছাল সিদ্ধ করতে হয়। লাল রং ‘রং গাছ’ নামক গাছের শিকড় থেকে পাওয়া যায়। হলুদ ও সবুজ রংও তৈরি করা যায়। আমগাছের ছাল মিশ্রণে এবং নীল ও হলুদের মিশ্রণে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ চমৎকার সবুজ রং পাওয়া যায়। প্রত্যেক রং তৈরির প্রণালী পূর্ববর্ণিত নীল রং তৈরির পদ্ধতির মত।
তারা মদ চোলাই করে নেয়। নদী বা ঝর্না থেকে মাটির কলসীতে করে পানি আনে, ঢেকির সাহায্যে ধান থেকে চাল বের করে। চাল দিয়ে নানা রকম পিঠা তৈরি করে এবং ঘর-সংসারের অন্যান্য কাজ করে। তারা পুরুষদের সঙ্গে ঝুম চাষের কাজও করে থাকে।
অলংকারাদি : চুলের কাটা-চারাং বা চেন শুদ্ধ চারুক, চুলা ফুল (চুলের ফুল), কানের দুল-জামুলী, করম ফুল বা কাজাফুল, বাজুর, কানফুল প্রভৃতি। গলার মালা ও হার-চিক, হাসুলী, তে’লহরী ছড়া, হাল ছড়া, টেনগা ছড়া, পিজী ছড়া (পুঁতির) প্রভৃতি। অন্তর-তাজুর, বাজু। বলয় বালম-কুড়ি খাড়ু, বালা খাড়ু, বাহু, হাতির দাঁতের বালা। নাকফুল বা নথ-সোনার নথ, নাকফুল। মাত্র কয়েকটি অলংকার সোনার ছাড়া সমস্তই রূপার হয়ে থাকে।
শবদাহ : তারা শবদাহ করে থাকে এবং ৭ দিন ধরে শোক প্রকাশ করে। এই ৭দিন তারা নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করে কোন মাছ, মাংস, ডিম খায় না। এ রকম ব্যবস্থা অন্যান্য উপজাতির মধ্যে দেখা যায় না। পুত্র সন্তানেরা মাথা কামিয়ে মৃত আত্মার শান্তি ও মুক্তির জন্য নানা রকম সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মানুষ্ঠান পালন করে থাকে। তারা নিজেদের তৈরি মদ, জাগারা, কানজী প্রভৃতি সুরা পান করে এবং হুঁকা ও পাইপ দিয়ে ধুমপান করে। তাদের আতিথেয়তা প্রবাদের মত। তারা সহজ, সরল, সৎ এবং স্বভাবতঃ অদূরদর্শী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here