রংপুরের লোকজ সংস্কৃতি ও মেলা

0
8

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
শতাব্দী আগে রংপুর অঞ্চলে মেলার প্রবর্তন হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে কৃষি ও কুটিরশিল্প বিস্তারের সাথে সাথে মেলা সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে- এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। মেলা শুধু পণ্যের সমাহার নয়, নয় শুধু বিনোদনের পশরা, এটা সৌহার্দের প্রতীক- সম্প্রীতির প্রতীক। মেলাকে ঘিরে সংস্কৃতির নানাবিধ বিনোদন ছাড়াও আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকা- জড়িত। মেলায় যেমন চিত্তবিনোদনের আয়োজন থাকে তেমনি থাকে রকমারি দ্রব্যাদির সমাবেশ। এ জনপদে (রংপুর) বহুপ্রকার মেলার বিপুল আয়োজন ছিল, যার কোন কোনটি এখনও আয়োজিত হয়। অতীতে রংপুর জেলায় যেসব স্থানে মেলা বসতো এবং কোথাও কোথাও এখনও বসে, সেসব মেলার মধ্যে বৈশাখী মেলা অন্যতম। ইদানিং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষি মেলা ও বৃক্ষ মেলা’র আয়োজনও চোখে পরার মতো। রংপুর অঞ্চলের প্রায় সব বড় বড় শহরে এ ধরনের মেলার আয়োজন লক্ষ্য করা যায়। তবে অত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যগত কিছু মেলার অবস্থান সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক।

বৈশাখী মেলা: বৈশাখী মেলা জেলা শহরেতো বটেই, গ্রামাঞ্চলেও এর ঐতিহ্যগত আয়োজন আজও মুগ্ধ করে। যেমন- রংপুর শহরের বাইরে নিসবেৎগঞ্জ, পীরগঞ্জের কালসাভারা, পীরগাছার চ-িপুর, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, খেজমতপুর, ধাপেরহাটের তেলাস, কুড়িগ্রামে প্রচ্ছদের বৈশাখী মেলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ মেলাগুলোর দু-একটি মাসব্যাপী হয়। অষ্টমী ও বারুনীর মেলা: কুড়িগ্রামের চিলমারিতে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে অষ্টমীর ¯œানের দিনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। রংপুর বিভাগের সবচেয়ে বড় মেলা এটি। এ মেলায় কয়েক লক্ষ পূণ্যার্থীর সমাবেশ হয়। একই দিনে কুড়িগ্রামের গওহর পার্ক মাঠেও (মজিদা কলেজ মাঠ) একটি মেলা বসে। মেলাটিতে ব্যাপক শিশুর সমাবেশ হয় বলে একে চেংড়ার মেলা নামে অভিহিত করা হয়। এ মেলায় মূলত কৃষকরা রসুন বিক্রি করে। তাই এ মেলাকে স্থানীয়ভাবে রসুনের মেলা নামেও অভিহিত করা হয়। অষ্টমীর ¯œান উপলক্ষে বদরগঞ্জের ট্যাক্সের হাটের করতোয়া মেলা, দামোদরপুরের শেকেরহাট মেলা, রংপুর সদরের খটখটিয়ার মেলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রংপুরের চব্বিশ হাজারী, পীরগঞ্জের জাফরপাড়া, পাটগ্রামের বড়বিল, হরিণসিংগার দিঘি প্রভৃতি এলাকার মেলাগুলো বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এদিকে রাজারহাটের বৈদ্যবাজার এলাকায় মাসাম কুড়ার মেলা বেশ ঐতিহ্য বহন করছে এখনও। কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও লালমনিরহাট থানার সীমান্তে একটি বিরাট পুকুরের পারে অনুষ্ঠিত সিন্দুরমতির মেলা ও যশোহারার মেলা বিশেষ উল্লেখ্য। যশোহারার মেলায় প্রচুর পরিমাণে খেজুর বিক্রি হয় বলে একে খেজুরের মেলাও বলা হয়, এ মেলায় প্রচুর পাখিও কেনা-বেচা হয়। এদিকে জলঢাকার ডিমলার টটুয়ায় বারুণীর মেলা আজও তার প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা: রংপুরের হাজিরহাট, গঙ্গাচড়ার ধামুর, পীরগাছার কান্দিরহাট ও অন্নদানগরের যাদুলস্করে চৈত্র সংক্রান্তিতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মহরমের মেলা: রংপুর মিঠাপুকুরের ছড়ানের হাট, শুকুরের হাট, শঠিবাড়ির হাট, মিঠাপুকুর বাজার, বড়দরগাহ্র হাট, মোসলেম বাজার, গংগাাচরার মহীপুর, কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ, চওড়া হাট, বালার হাট, ফকিরের হাট প্রভৃতি স্থানে মহরম উপলক্ষে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এদের মধ্যে কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ’র মেলাটি তাজিয়ার মেলা নামে পরিচিত। চড়ক মেলা: রংপুর বুড়িরহাটের চব্বিশ হাজারী, লাহিড়ীর হাট, গংগাচরার চন্দনহাট, তারাগঞ্জের চড়ক ডাংগা, মিঠাপুকুরের হাছিয়াহাট, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বড়ভিটায় চরক মেলা বসে। রাস মেলা: পীরগঞ্জের তাম্বলপুরহাট ও ভোলানাথেরহাটে অগ্রহায়ণ মাসের শেষ সপ্তাহে ১০১টি মূর্তির মেলা হয়। এ মেলা রাস মেলা নামে পরিচিত। মনসার মেলা: পীরগঞ্জের বিষ্ণুপুরের কচুবাড়িতে মনসা পূঁজা উপলক্ষে এ মেলা হয়। নানকার মেলা: এ মেলা মিঠাপুকুরের নানকার বাজারে রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দিন অনুষ্ঠিত হয়। মাঘী পূর্ণিমার মেলা: রংপুর পীরগঞ্জের এ মেলাকে মাদারগঞ্জের মেলাও বলা হয়। এ মেলা মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে দু’সপ্তাহ জুড়ে হয়। পৌষ সংক্রান্তি মেলা: পীরগঞ্জের চৌধুরী মেলা ও ভেন্ডাবাড়ির মেলা পৌষ সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। বৃহত্তর রংপুর জেলার অন্যান্য জেলাগুলোতেও এ মেলা লক্ষ করা যায়। ঈদ মেলা: এ অঞ্চলে ঈদের দিনে অনেক স্থানে মেলা বসে। তারাগঞ্জের চৌপথী মেলা, কাউনিয়া ও তিস্তার মেলা, ডাংগীরির হাটের মেনা নগর, দামোদরপুর নারাবাড়ী প্রভৃতি স্থানে ঈদ মেলা উল্লেখযোগ্য। ওরশ মেলা: এ মেলা স্থানীয় পীর মাশায়েখদের মাজার কেন্দ্রীক আয়োজন হয়। রংপুর অঞ্চলে এ মেলার আয়োজন লক্ষনীয়, গংগাচড়ার পাকুরিয়ার কছিমুদ্দিন পীরের বাৎসরিক ওরসের সময় এ মেলা হয়। মাঘ মাসের ৫-৬ তারিখে কোলকন্দের আলী পীরের ওরস অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলাকে পীরের হাটের ওরস মেলা বলা হয়। এছাড়া দোয়ালী পাড়া, তকেয়া শরীফ ও তারাগঞ্জে ওরস উপলক্ষে মেলা আয়োজন করা হয়। বউ মেলা: মহারাজা তাজহাট এ মেলার প্রবর্তন করেছেন বলে প্রচার আছে। এলাকার নারীদের বিনোদনের জন্য এ মেলা পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়। পশুর মেলা: এ মেলা নীলফামারীর দাড়োয়ানীর মেলা, ডোমারের পাঙ্গার মেলা হিসেবে পরিচিত। মাসব্যাপি এ দু’টি মেলায় প্রচুর গবাদি পশু ক্রয়-বিক্রয় হয় বলে একে পশুর মেলা বলা হয়ে থাকে। দূর্গা পূজার মেলা: রংপুরের সমগ্র অঞ্চলে এ মেলা হয়। মূলতঃ ষষ্টি থেকে শুরু হয়ে বিজয়ার দিন পর্যন্ত এ মেলাগুলো চলে। অতীতে এ মেলা হত রাজা ও জমিদারদের দূর্গামন্ডপের নিকটবর্তী। এখন যেখানেই দূর্গামন্ডপ সেখানেই এ মেলার অস্তিত্ব লক্ষনীয়। কালীর মেলা: কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর মাদাই খালের কালী মন্ডপকে ঘিরে কালী পূঁজার সময় এ মেলা হয়। এ মেলাটি মাদাইখালের মেলা নামে পরিচিত। এ মেলাকে উপলক্ষ্য করে ভাওয়াইয়া যুবরাজ কছিমুদ্দিন লিখেছিলেন অমর গান “সবাই মিলি বুদ্ধি করি ১২ হাত বানাইছে কালী, কালীর মেলা মাদাইখেলোতেু। কালীর মেলা নীলফামারীর কালীগঞ্জে, লালমনিরহাটের কুলাঘাটে এবং কুড়িগ্রামের দাসের হাটে ব্যাপক ভাবে আয়োজন করা হয়। দাসেরহাটের কালী মূর্তিটি উভয় বঙ্গের মধ্যে বড়। রোকেয়া মেলা: প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর পায়রাবন্দে রোকেয়া মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মহিয়সী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে সরকারি ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ মেলাটি পরিচালিত হয়। এদিকে কুড়িগ্রামের কৃতীকন্যা প্রয়াত নারী নেত্রী শামসুন নাহান চৌধুরী সানু’র জন্ম দিন ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় সানু মেলা। এছাড়াও হালের কারুশিল্প মেলা, বই মেলা, পিঠা মেলা, শিল্পমেলা, বিজয় মেলা (বিজয় দিবসে হয়), পর্যটন মেলা, আবাসন মেলা, ব্যাংকগুলোর ঋণ মেলা, সঞ্চয় মেলা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। যুগের চাহিদার সাথে মিল রেখে আগামী দিনে হয়তো নানা ধরনের মেলার জন্ম হবে আবার অনেকগুলো হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে। সেগুলোকে হয়তো খুঁজতে হবে ইতিহাসের পাতায়। আমাদের লোক সংস্কৃতির চিরায়ত এ ধারা আধুনিক ও যান্ত্রিক সভ্যতার আঘাতে আজ অনেকটাই বিপর্যস্ত। তবুও এ সকল মেলা অতীত ঐতিহ্যের স্মারক ছাড়াও এ অঞ্চলের মানুষের স্বতন্ত্র সত্তার পরিচয় বহন করে। মেলাগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। মেলাগুলোকে আর্কষণীয় করার জন্য কোথাও কোথাও খেলাধূলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। আবার কোথাও কোথাও খেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে একদল মানুষ পণ্যের পশরা নিয়ে বসে যা মেলার রূপ ধারণ করে। যেমন নৌকা বাইচের সময় নদীর পাড়গুলি মেলার রূপ পরিগ্রহ করে।

মেলা এবং মেলার বাইরে যে খেলাগুলো এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে সেগুলোর অন্যতম হল- হাডুডু, কাবাডি (কাপাটি), লাঠি খেলা, দাঁড়িয়া বান্ধা, গোল্লাছুট, এক্কা-দোক্কা, বউ-ছুট, লুকোচুরি, চেংকুডারা বা চেংগু-পেন্টি (বলা যায় বর্তমান ক্রিকেটের এ দেশীয় আদিরূপ), তরবারি খেলা, পাতা খেলা, গুড্ডি বা ঘুড়ি উড়ানো খেলা, কেরাম খেলা, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, ফুটবল, আটকোটা, উরূণ-গাইন, লুডু, পিংপং, পিন্টু-পিন্টু, লুকোচুরি প্রভৃতি। নিজস্ব ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই খেলাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের একদা শরীর চর্চা ও আনন্দ বিনোদনের মাধ্যম ছিল। অবশ্য এখন আধুনিক খেলাধুলার মধ্যে প্রচলিত ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, টেনিস, ক্রিকেট, মার্শাল আর্ট প্রভৃতির চর্চাই বেড়েছে অনেক বেশি। এগুলোর অধিকাংশই শহর কেন্দ্রিক। এ জনপদে অধিকাংশ মেলায় জুয়া খেলার অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। জুয়া নির্দিষ্ট একটি খেলার নাম নয়, যে খেলাটি বাজি ধরে খেলা হয় এবং বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা লাভ করা যায় তাকেই বাজী যা স্থানীয়ভাবে জুয়া খেলা বলা হয়। এ খেলাটি মেলার সময় ব্যাপক রূপ পায়। সাধারণত যে বিষয়গুলি আমাদের কাছে আদিকাল থেকে জুয়া হিসেবে দৃশ্যমান সেগুলো হচ্ছে তাসখেলা, চুড়ি খেলা, ডাব্বু খেলা, পাশা খেলা, হালের হাউজি খেলা প্রভৃতি। এ খেলাগুলো বিনোদন অপেক্ষা পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বৈকল্য সৃজনে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

মেলায় খেলাধূলা ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে যারমধ্যে লোক নৃত্য, ভাওয়াইয়া, আধূনিক, রবীন্দ্র নজরুল সঙ্গীত প্রভৃতি লক্ষ করা যায়। এখানে জারি গান, পুঁথি, যাত্রা, পালাগান, কুশানগান, সার্কাস, পুতুলনাচ প্রভৃতি দৃশ্যমান।

মেলাগুলোতে যে সকল পণ্য ও শিল্প-সম্ভার পাওয়া যেত তার অধিকাংশই রংপুরজাত। যেমন- চারুকারু শিল্প: এ জনপদে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু কুটির শিল্প। লোকায়ত শিল্পদ্রব্যগুলোর মধ্যে ছিল রেশম, তাঁত, সতরঞ্জি, পাট, মৃৎশিল্প, কাঁসা, পিতল ইত্যাদি। এছাড়াও কর্মকার, স্বর্ণকার, বয়নকার, দর্জ্জি ইত্যাদি পেশার মানুষ সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করত। বাঁশ-বেত: রংপুর অঞ্চলের বাঁশ ও বেতজাতদ্রব্য স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও অন্যত্র রপ্তানী করা হতো একটা সময়। বাঁশ-বেত ও কাঠজাত দ্রব্য তথা- ফুলদানী, কলমদানী, ছাইদানী বাঁশের ডাড়কী, বানা, খলই, জনগা, পলো, ভোরং, ডারকি, হেংগা, কবুতরের বাসা, ঘোরপা, ডালি, কুলা, চাটাই, চালুন, খাচা, চাঙ্গারী, টোপা প্রভৃতি ব্যবহারের অপরিহার্য সামগ্রী প্রচলিত বাজার ছাড়াও মেলায় পাওয়া যেত। তাঁত: এটি বেশ প্রাচীন শিল্প। অতি প্রাচীনকাল হতেই রংপুরে তাঁত শিল্পের কার্যক্রম ছিল। তাঁতীদের উপর এ অঞ্চলের মানুষ তাদের পোশাকের জন্য নির্ভরশীল ছিল। মাহিগঞ্জ, বদরগঞ্জ, কালিগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সৈয়দপুরে এ শিল্পে বেশ সক্রিয় ছিল। সৈয়দপুরের শিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃতও ছিল। বর্তমানে রৌমারীর তাঁত শিল্প আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এ পণ্যগুলো আমাদের মেলায় পণ্য তালিকায় দেখা যায়। শতরঞ্জি: অতীতের মতো এখনও শতরঞ্জি তৈরি হয় এবং বিদেশে রপ্তানী হয়। নিসবেতগঞ্জ এবং রংপুর জেলখানায় আগে থেকেই এ শিল্প ছিল। পাট: রংপুরে পাট দিয়ে যেমন থলে, বস্তা, কার্পেট তৈরি হয় তেমনি গ্রামীণ মেয়েরা পাট দিয়ে সুন্দর সুন্দর শিকা তৈরি করে। রেশম: রংপুরের রেশম শিল্পের বিপুল খ্যাতি ছিল। ইতিহাসে দেখা যায় ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে রংপুর হতে ইউরোপে রেশম রপ্তানি হয়েছিল। মৃৎ শিল্প: মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খোরা, মটকা, কলসী, সানকী, বদনা, ঘটি ইত্যাদি ছিল রংপুরের গ্রামীণ জীবনে প্রাত্যহিক ব্যবহার্য দ্রব্য। মাটির পাট দিয়ে কুয়া নির্মাণ ও টালি দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয় এখনও। বিভিন্ন উৎসব ও মেলায় মাটির তৈরি পুতুল, নৌকা, হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি পুতুল জনপ্রিয় ছিল। কাসা, পিতল ও লোহা: রংপুর অঞ্চলের কাসা, পিতল ও লোহার তৈজস ও অন্যান্য শিল্পজাত দ্রব্য জনপ্রিয় ছিল। কামার নির্মিত দা, কুড়াল, কোদাল, বাইশ, ছুরি, বটি, কাটারি, বর্শা, বল্লম, কাস্তে, শাবল, পাসুন প্রভৃতি মানুষের সাংসারিক কাজকর্মে এবং আত্মরক্ষায় বহুল ব্যবহৃত। নকশী কাঁথা: এক সময় রংপুরে নকশী কাঁথার বিপুল প্রচলন ছিল। গ্রামীণ সমাজে এ শিল্পের বিকাশ হলেও শহর জীবনে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কাঠ শিল্প: কাঠ শিল্পের নিদর্শন এ অঞ্চলের বাড়ি-ঘরের জানালা দরজায় সুন্দর সুন্দর চিত্রকর্মর দ্বারা প্রকাশিত। চৌকি, মাইপোষ, খাট, পালকী, টেবিল, চেয়ার, আলনা, সিন্ধুক, আলমারি ইত্যাদি তৈরিতে কারুশিল্পের নিদর্শন লক্ষনীয়। এ সকল দ্রব্য মেলায় সহজলভ্য। তামাক শিল্প: রংপুরের উৎপাদিত তামাক উন্নতমানের সিগারেট, চুরুট এর কাঁচামাল হিসেবে বিদেশে রপ্তানী হতো। হারাগাছ অঞ্চলে এই তামাক নিয়ে গড়ে উঠেছে বিড়ি শিল্প। বিড়ি শিল্পের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্য দিয়ে গুল ও জর্দা প্রস্তুত হয়। মেলায় তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় ছাড়াও ডাব্বা- হুকার প্রচুর বিক্রয ছিল একটা সময়। ঢেঁকি শিল্প: রংপুরের গ্রামীণ জীবনে ব্যবহৃত ঢেঁকি- জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। একটা সময় এই ঢেঁকিই ছিল গ্রামীণ মানুষের জীবিকার অন্যতম যন্ত্র। ঢেঁকিছাঁটা চালের কদর এখনও আছে। যদিও যান্ত্রিক সুবিধার যুগে ঢেঁকি শিল্প বিপন্ন। বস্ত্রাভ্যাস: এখানে স্থানীয় পুরুষরা আংগা (শার্ট বা জামা), নেংটি (লজ্জা নিরবারনের স্বল্প বসন), তহবন (তবন বা লুঙ্গি), গামছা, গেঞ্জি, ধুতি ,শীতের দিনে কাঁথা, গজি (চাঁদর) পরিধান করে। মেয়েরা খাড়ি (শাড়ি), ফোতা ছেওটা, ব্লাউজ ইত্যাদি পরিধান করে। ঐ সকল বস্ত্রের অনেকগুলিই স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত ও বুনন হতো। যেগুলো মেলায় পশরা ধরে উৎপাদনকারীরা বিক্রি করতো এবং এখনও তা বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হয়। খাওয়া দ্রব্যাদি: মুড়ি, মলা (মোয়া), খই, জলপান (মুড়কি), গজা, খোরমা, কটকটি, গুলগুলিয়া, তেল পিঠা (তেলুয়া পিঠা), চিতই, গরগড়িয়া, চাউল ভাজা, চালের গুড়া, গমের গুড়া, ভাত, পান্তাভাত, কড়কড়া ভাত, পিঁয়াজ, মরিচ, ভর্তা, শাক, সুকতানি, মাছ, মাংস, ডাল, শুটকি, শেদল, প্যালকা, শোলকা, হালের রুটি, পুড়ি, পরাটা, মিষ্টি, মাখন, পাউরুটি, সিঙ্গারা, খাজা, লবঙ্গ, বালুসাই, নিমকি, জিলাপি, গজা ইত্যাদি খাবার রংপুর অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে আজও টিকে আছে এবং সারা বছর জুড়েই এ গুলো আমাদের জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তবে অধিকাংশ পিঠা ও মিষ্টি জাতীয় সকল খাদ্যদ্রব্যই মেলার মূল পশরার অন্যতম।

লেখক: আব্রাহাম লিংকন,
পাবলিক প্রসিকিউটর, কুড়িগ্রাম এবং সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট বার ও কলাম লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here