রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্যকর্ম ও লোক সংস্কৃতি

0
3

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা :

রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন। সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য মণ্ডিত এ জনপদের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলা ভাষার যেমন আছে পরিশীলিত রূপ তেমনি অঞ্চল ভিত্তিক গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত রয়েছে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা। ভৌগলিক কারণে হোক বা শারীরিক গঠনের জন্য হোক রংপুরের শিক্ষিত জনেরা বাংলাদেশের অনেক জেলার অপেক্ষা পরিশীলিত ভাষায় কথা বলতে পারেন। তাদের উচ্চারণে কোন বিকৃতি নেই, নেই অস্পষ্টতা। তারা অনায়াসে আঞ্চলিকতা সম্পন্ন ভাষা বা উচ্চারণ পরিহার করতে পারেন। যা দেশের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। ম্যাক্স মুলার বলেছেন ‘‘The real and natural life of language is in its dialects’’। ভাষার প্রকৃত ও স্বাভাবিক জীবন তার উপভাষাগুলিতে। উল্লেখ্য বাংলা ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয়। রংপুরেও পরিশীলিত ও মার্জিত ভাষার সমান্তরাল রংপুরের গ্রামাঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষাও প্রচলিত রয়েছে। আঞ্চলিক ভাষা, যখন এ গ্রামাঞ্চলের জনপদে উদ্ভব হয়েছে নিঃসন্দেহে সে সময় হতে গ্রামীণ জনপদ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে আসছে। এ ভাষার উচ্চারণগত সহজবোধ্যতা, সাবলীলতা ও শ্রুতিমাধুর্য অসামান্য। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হয়েছে সাহিত্য-সঙ্গীত, প্রবাদ-প্রবচন, ছড়া, গীত ইত্যাদি যা মানুষের আনন্দের উপকরণ। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের মাত্র কটির নামকরা হলো, ষোড়শ শতকের কবি মুহম্মদ কালার নেজাম পাগলার কেচ্ছা। মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি কবি হেয়াত মামুদের রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। বেগম রোকেয়ার রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার শব্দাবলীও আছে । পরবর্তী সময়ে নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়াতার’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নুরলদীনের সারাজীবন’, নুরুল ইসলাম কাব্য বিনোদের ‘হামার অমপুর’, আবুল কাশেমের ‘হামার দ্যাশ হারাগাছ’, সিরাজুল ইসলাম সিরাজের ‘মরা মানুষের মিছিল’, আনিসুল হকের ‘নাল পিরান’, মকসুদুল হকের ‘শঙ্খামারীর ঘাট’, সাখাওয়াত হোসেনের ‘বাহে নিধূয়া পাথার’, নাসিমুজ্জমান পান্নার ‘নাক ফুল’ এবং মতিউর রহমান বসুনিয়া রংপুরের ভাষার অভিধান ও অনেক কবিতা লিখেছেন এই ভাষায় । তাছাড়াও অনেকে রংপুরের ভাষা ব্যবহার করেছেন তাঁদের রচনায়। রংপুরের শিক্ষানুরাগী জমিদার সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’ এর প্রথম সংখ্যায় (প্রকাশকাল ১২১৩ বঙ্গাব্দ) রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে বহুল তথ্য সমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়াও অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দিন তাঁর ‘রংপুর সংবর্তিকা’ গ্রন্থে রংপুরের ভাষা শিরোনামে প্রবন্ধ রচনা করেছেন । রংপুরের ভাষা উদীচ্য বা বরেন্দ্র উপভাষার গোত্রভুক্ত ।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার একটি উদাহরণ – আমি ঢাকা যেতে চাই- ‘মুই ঢাকাত গেনু হয়’

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য:

১) অনুনাসিক বর্ণ রক্ষিত

২ ) শ্বাসাঘাতের নির্দিষ্ট সহান নেই

৩) শব্দের আদিতে ‘র’ এর আগম ও লোপ, যথা: রস – অস, রাম বাবু – আম বাবু, রংপুর – অমপুর, রক্ত – অক্ত। ‘‘আম বাবুর বাগানোত ম্যালা রাম পাকছে।’’

৪) অধিকরণ কারকে ‘ত’ বিভক্তির প্রয়োগ। ‘‘বাবা বাড়িত নাই’’।

৫) অপিনিহিতর ব্যবহার: অদ্য > আইজ , কল্য > কাইল

৬) শব্দের মধ্যবর্তী ব্যঞ্জনবর্ণ লোপ : কহিল > কইল

৭) ‘ছ’ এর ব্যবহার ‘চ’ রূপে : মাছ > মাচ

৮) ‘জ’ এর স্থলে ‘ঝ’ এর ব্যবহার

৯) শব্দের মধ্যবর্তী স্থানে অতিরিক্ত স্বরবর্ণের ব্যবহার, যেমন : গেলে > গেইলে, বোন > বইন,

১০) ‘ল’ এর স্থলে ‘ন’ এর উচ্চারণ হয়। যেমন : লাট > নাট, লাগে > নাগে

১১) অপাদান কারকে ‘‘হাতে’’, ‘‘টে’’ বিভক্তির প্রয়োগ। ‘‘বইখান কারটে আনলু’’।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার কতিপয় শব্দ :

অকে, অমপুর, অক্ত, আঙা, আন্দন, উদিনকা, আইগন্যা, ক্যাংকা, ফ্যাদলা, এইংকা, উন্দাও, বাইগোন, বাহে, সুন্দরী, তাংকু, দলান, ঢ্যানা, বাড়ুন, গাবরু, কাপাট, কইনা, এইকনা, ছাওয়া ইত্যাদি ।

রংপুরের সাহিত্যকর্ম :

অনেক বাংলা সাহিত্যের গবেষক ও ঐতিহাসিক বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যের আদি নীড় রংপুর । রংপুরের ভাষার যেমন প্রাচীনত্ব আছে তেমনি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনত্বের রংপুরের অংশীদারিত্ব আছে । বাংলাভাষা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ অর্থাৎ প্রাচীন বাংলায় রচিত ৫১টি পদ অখণ্ডিত ৪৭ পদই বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন, রচয়িতা ২৪ জন কবি । ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র মতে যা রচিত হয়েছে ৭ম শতাব্দী হতে ১০ শতাব্দীর মধ্যে । আর এই পাণ্ডুলিপিটি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয়েছে নেপাল রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে। আবিষ্কারক মহা মহোপাধ্যায় হর প্রসাদ শাস্ত্রী ।

অনেকে মনে করেন চর্যা পদের কবিদের অনেকের পদচারণা হয়তো ঘটেছিল রংপুরে । ফলে চর্যাপদের ভাষার শরীর বৃত্তে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা-ভঙ্গির অনেক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন –

‘‘টলিত মোর ঘর নাহি পর বেশী
হাড়িত ভাত নাই নিতি আবেসী।’’

এই লাইন দু’টিতে ‘তে’ বিভক্তির স্থলে ‘ত’ বিভক্তির প্রয়োগ রংপুরের ভাষার বৈশিষ্ট্য। রংপুরেও এমন বলা হয়, ‘বাবা বাড়িত নাই’। তেমনি নঞক অব্যয়ের ব্যবহার ব্যবহার ক্রিয়াপদের আগে। যেমন – ‘গাছের তেস্তুল কুম্ভীরে ন খায়’ অথবা ‘দুলি দুহি পিঠা ধরন ন জাই’, যা রংপুরের উদাহরণ। না যাও, না খাও এবং মোর, তোর, সুতি, পোহাই, ঘিন, খাল ইত্যাদি শব্দ রংপুরেও ব্যবহৃত হয়।

রংপুর হতে স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন আবিষ্কার করেছেন নাথ গীতিকা, যা ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছে বলে কোন সংশয় নাই। মধ্যযুগের অনেক বিশিষ্ট কবি কাব্য রচনা করেছেন রংপুরে। তাঁরা হলেন কমল লোচন, হরিশ চন্দ্র বসু, হেয়াত মামুদ, শাকের খাদেম, মুহম্মদ কালা, দ্বিজহরি, ধুরহানুল্লাহ, শরিয়তুল্লাহ।

আধুনিক যুগের অনেক কবি সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, আর তাঁরা হলেন, পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন, সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী, জামাল উদ্দিন। রামনারায়ন তর্করত্ন যিনি বাংলা ভাষার প্রথম মৌলিক নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব সর্বস্ব’ রচনা করেন এবং কুন্ডির জমিদার প্রদত্ত ৫০/- টাকা পুরস্কার লাভ করেন। হর গোপাল রায়, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, অতুল গুপ্ত, অতুল প্রসাদ সেন, শেখ ফজলুল করিম, খেরাজ আলী, রবীন্দ্র নাথ মৈত্র, তুলসী লাহিড়ী, নুরুল ইসলাম কাব্য বিনোদ, সৈয়দ শামসুল হক, আশুতোষ দত্ত, মোতাহার হোসেন সুফী, মতিউর রহমান বসুনিয়া, মহফিল হক, মোনাজাত উদ্দিন, মুহম্মদ আলীম উদ্দিন, মঞ্জু সরকার, আনিসুল হক, আব্দুল হাই শিকদার, সৈকত আসগর সহ আরো অনেক সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে অবদান রেখেছেন এবং এখনও অনেকে সাহিত্যকর্মে সচল আছেন।

লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতি :

লোকসাহিত্য ও লোক সংস্কৃতিতে রংপুরের অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আর এসব কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়েছে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায়। আঞ্চলিকতার দিক দিয়ে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালীর বিপরীত প্রান্তের লোকসঙ্গীত। ভাওয়াইয়া রংপুরের লোকসঙ্গীত ধারায় সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ শাখা। ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিন ১৯৫৪ সালে ভাওয়াইয়াকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত করেন। ভাওয়াইয়া লোকসঙ্গীতের ধারায় এই অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন পেশার মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-বেদনাকে আশ্রয় করে লোকের মুখেমুখে রচিত এবং বিপুল আবেদনময় সুরে বাঁশি ও দোতরার মতো বাদ্যযন্ত্র যোগে গীত হয়ে আসছে।

আঞ্চলিক নামানুসারে ভাওয়াইয়া ৫টি ধারায় বিভক্ত, ‘ভাব’ ‘ভাওয়া’, ‘বাওয়া’, ‘বাউদিয়া’ প্রভৃতি শব্দ হতে ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি বলে গবেষকরা মতামত ব্যক্ত করেছেন।

কয়েকটি জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া – ওকি গাড়িয়াল ভাই, তোরসা নদীর ধারে ধারে, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে, কি ও কাজল ভোমরা।

তথ্য সূত্র :
রংপুর জেলার ইতিহাস – জেলা প্রশাসন (২০০০ সাল)
রংপুর সংবর্তিকা – মুহাম্মদ আলিম উদ্দিন
সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী (জীবনীগন্থ) – সুশান্ত চন্দ্র খাঁ
রঙ্গপুর-রংপুর, ইতিহাস থেকে ইতিহাসে – মোস্তফা তোফায়েল।

সার্কিট হাউস লেন, রংপুর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here