বাঙ্গালি বিয়ের রীতি রেওয়াজ -পরম্পরা এবং সমকালের ভাবনা

0
4

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
তরুণ মজুমদারের ছবি ‘বালিকা বধূ’র একটি দৃশ্যে দেখা গেছল একটি গ্রামে গৃহকর্ত্তা তাঁর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন পুরোহিতের ভুলভাল মন্ত্রোচ্চারণে বিরক্ত হয়ে তিনি গ্রামের নিমন্ত্রিত প্রতিবেশীদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখেন ‘ বলুন দেখি স্ত্রী মানে কি ? ’ গ্রামের বয়স্ক লোকেরা কেউ বললে ‘গিন্নি’ কেউ বললে ‘বউ’ কেও বললে ‘পরিবার’। গৃহকর্ত্তা রুপী সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গমগমে গলায় বলে উঠেছিলেন – স্ত্রী মানে হল ‘গৃহিনী, সচিব , সখী , মিতা, প্রিয় শিষ্যা , ললিত কলা বিধৌ।’ শ্রোতারা কেউ বুঝে কেউ না বুঝে মাথা নেড়েছিলেন। ‘স্ত্রী’র এই সংজ্ঞা টি কিন্তু আমাদের শাস্ত্রের বচন নয়। কালিদাসের একটি পদ।

‘বিবাহ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি গত অর্থ হচ্ছে বি-পূর্বক বহ্ ধাতু ঘঞ্। বি উপসর্গের অর্থ বিশেষ আর বহ্ ধাতুর অর্থ বহন করা। বধূ শব্দটিরও অর্থ যাকে বহন করে আনা হয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে একজন পুরুষের বিবাহ করা মানে একজন নারী কে বিশেষ রূপে বহন করার দায়বদ্ধতা স্বীকার করা। এই সময়ের একজন আধুনিক মানুষ, বিশেষ করে একজন আধুনিক নারী, বিবাহের এই সংজ্ঞা তে প্রবল আপত্তি জানাবেন। আজকের নারী কোনো বিশেষ পুরুষ দ্বারা বাহিত হতে চান না। তিনি ঐ কালিদাসের পদটির মত অথবা রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার মতনই চান –

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে
সংকটে সম্পদে
সন্মতি দাও কঠিন ব্রতে
সহায় হতে
পাবে তবে চিনিতে মোরে
।’

তাই বোধহয় চিন্তা করার সময় এসেছে আমাদের পারম্পরিক বিবাহ-সংস্কৃতির কিছু সংস্কারের প্রয়োজন কি না !

একটি জাতি হিসেবে আমাদের সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য থাকাটা অবশ্যই প্রয়োজন। সমাজকে অস্বীকার করে সমাজে বাস করাটা সভ্যতার পরিচয় নয়। কিন্তু এই সময়ের নিরিখে একটি প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও একটি পুরুষ যখন একটা নূতন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সে সময় কতটা ধর্মের প্রতি , কতটা ঐতিহ্যের প্রতি , কতটা লৌকিকতার প্রতি নিবেদিত প্রাণ থাকবে আর কতটা তার সময়ের বাস্তবতার প্রতি সৎ থাকবে সেটাও কিন্তু ভাবনার বিষয়। মুশকিল হচ্ছে আমাদের সব শাস্ত্রই রচনা করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।কারণ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রবল ভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার দিকে ঝুঁকে আছে। তাই বিয়ের নিয়ম কানুনের মধ্যেও প্রছন্ন ভাবে লুকিয়ে আছে পুরুষকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি।আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি অন্যতম প্রথা হল সম্প্রদান। ‘সম্প্রদান’ শব্দটির অর্থ হল স্বত্বত্যাগপূর্বক দান। বিবাহে ‘সম্প্রদান’-এর মন্ত্র হল—‘তুয়ভ্যমহং সম্প্রদদে’ অর্থাৎ ‘তোমায় আমি আমার সালংকারা কন্যাকে দিলাম।’ আরো বলা হয় ‘দূর্বাপুষ্পং ফলঞ্চৈব বস্ত্রং তাম্বুলমেবচ এভি কন্যা ময়া দত্তা রক্ষণং পোষণং কুরু।’ অর্থাৎ দূর্বা, ফল, ফুল, বস্ত্র এবং তাম্বুল সহ এই কন্যাকে দান করা হল। এবার তাকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পোষণ করার দায়িত্ব স্বামীর। ইংরেজি তে তর্জমা করলে শুনতে লাগবে যেন একটা Transfer of propertyর চুক্তি পত্র। কিন্তু আজকের দিনে মেয়েরা কোনো সম্পত্তি বিশেষ নয় যে মেয়ের বাবা নিয়ে তার স্বত্ব ত্যাগ করে জামাতার উপর সে স্বত্ব অর্পণ করে তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব দিয়ে দেবে। যে দেশে স্বয়ংবর প্রথা চালু ছিল একসময়ে সে দেশের হিন্দু বিয়ের পদ্ধতির মধ্যে কোথাও নারীকে তার বর নির্বাচনের বা গ্রহণ বর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পুরুষ কেমন পাত্রী নির্বাচন করবে সে সম্বন্ধে শাস্ত্রের বিধান – ‘ সৎকুলসম্ভূতা , সুলক্ষণা, বয়স্থা কন্যার পাণিগ্রহণ করাই বিধেয়।’ কিন্তু নারী কেমন বর নির্বাচন করবে তার কোনো নির্দেশ শাস্ত্রে নেই।

কনকাঞ্জলি নামের একটি অনুষ্ঠানের নিহিত অর্থ হল বিয়ের আগে কন্যা পিতার কাছে অন্নঋণ থাকে। ঋণী ব্যক্তিকে দান করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ, এই নিয়মে তাই বিয়ের আগে পিতার হাতে একমুঠো ধুলো দিয়ে কন্যা বলে সোনামুঠো নিয়েছিলাম,ধুলোমুঠি দিয়ে শোধ করলাম।অথবা কোথাও কোথাও মা মেয়ের ঠিক পেছনেই আঁচল পেতে থাকেন, মেয়ে মাথার ওপর দিয়ে চাল পিছনে ফেলে দেয়, মায়ের আঁচলে সেই চাল পড়ে।এ রকম তিন বার ফেলতে হয়। এ ভাবে বাবা মায়ের ঋণ শোধ করার প্রতীকী আয়োজনটি এ যুগের পরিপ্রেক্ষিতে নিতান্তই অর্থহীন।

কিন্তু আমাদের বৈদিক যুগে নারী পুরুষের অবাধে মেলামেশা করা এবং নারীদের নিজেদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার অধিকার ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ঋগ্বেদে ‘শমন’ নামের একটি উৎসবের কথা বলা আছে যেটি একটি এমন মেলা যেখানে পুরুষ ও নারী নিজেরা নিজেদের সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেওয়ার সুযোগ পেত। হিন্দুরা যে দাবী করে তাদের এখনকার বিবাহের রীতিনীতি বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে , ব্যাপারটা মোটেই সে রকম নয়। তা ছাড়া বৈদিক যুগে নবপরিণীতার বিবাহ বিশেষ একজনের সঙ্গে নয় বরের ভ্রাতাদের সঙ্গেও হত।

মনুর বিধানে অবশ্য এই প্রথা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। কোনো এক সময়ে বন্ধ হয়েও গেছে।
আসলে আমাদের এখনকার বিবাহ সংস্কৃতির বয়স ঠিক ততটা পুরোনো নয়।আমাদের বিবাহ বিধির কিছুটা শাস্ত্রীয় আর কিছুটা স্ত্রী-আচার।শাস্ত্রীয় অংশটি মোটামুটি এক রকম হলেও স্ত্রী আচার গুলির উপর আঞ্চলিক , পারিবারিক , সাম্প্রদায়িক কিছু ভেদাভেদ আছে। তবু খুব বড় রকমের পার্থক্য নেই।

আমাদের এখনকার বিবাহ-সংস্কৃতি এবং বিবাহ-বিধির প্রবাহ টিকে বুঝতে গেলে আমাদের একটু পিছিয়ে গিয়ে একেবারে বাঙালি জাতির জন্মের একেবারে গোড়ায় গিয়ে পৌঁছাতে হয়।তবে বাঙ্গালির সেই আদি পর্বের বিবাহ পদ্ধতির কোনো লিপিবদ্ধ ইতিহাস নেই। আর্য এবং আর্য পরবর্তী সমাজের যে টুকু বিবরণ পাওয়া যায় তা থেকে বাঙ্গালির বিবাহের রীতিনীতি সম্বন্ধে কোনো ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় না। আমরা যে টুকু জানতে পারি আর্য নামক এক সভ্য জাতি যখন ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে বসবাস করতে আরম্ভ করে , তখন অনার্য নামের প্রাক-আর্য শ্রেণীর মানুষ দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এই সংঘর্ষে আর্যরা জয়ী হলেও আর্য অনার্য সংস্কৃতির মিলন তখন থেকেই শুরু হয়।

আর্য অনার্য দ্রাবিড় মোগল নানা রক্তের মিশেছে বাঙ্গালির শরীরে। আর্যদের কাছে পরাজিত হয়ে অনার্যরা আর্য সংস্কৃতির রীতি নীতি গ্রহণ করতে লাগল।বাঙালি জাতির জন্ম ঠিক কতটা পুরোনো তা জানা না গেলেও জানা যায় যে দ্রৌপদীর স্বয়ম্ভর সভায় তিনজন বাঙ্গালি রাজা অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

খৃষ্ট পূর্ব চতুর্থ শতকে গঙ্গাবংশীয় বাঙালি রাজ্যের নাকি বিস্তার ছিল পাঞ্জাব অবধি। টলেমির বিবরণে এই তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু আর বিশেষ কিছুই জানা যায় না। এর পরে বাঙালির উপস্থিতির কথা জানা যায় চতুর্থ শতকের গুপ্ত যুগে। গুপ্তরা পুরো বাঙ্গালা কে জয় করতে পারেনি। গৌড় অঞ্চলে স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করতে লাগালেন শশাঙ্ক। অষ্টম শতাব্দীতে গোপাল রাজা হলে বাংলায় এক যুগান্তর এলো। এর পর পাল শাসনের নানা উত্থান পতন কাটিয়ে একাদশ শতাব্দীতে সেন বংশের উত্থান। এর পর বিজয়সেন বল্লাল সেন দের চেষ্টায় বঙ্গ রাজ্যের পরিধি বেড়ে উত্তরে গৌড়, পূর্বে কামরূপ, দক্ষিণে কলিঙ্গ, পশ্চিমে মগধের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে ছিল। লক্ষন সেনের আমলে আবার বাংলা চলে গেল পাঠানদের হাতে। চারশো বছর ধরে চলল পাঠান রাজত্ব। এর পরে শুরু হয় বাংলায় বিদেশী বনিকদের আনাগোনা। পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসী, ইংরেজ সবাই প্রথমে ব্যাবসা করতেই আসে এই অঞ্চলে। তার পর সিরাজদৌলার পতনের পরে ইংরেজদের এই বাংলা কব্জা করে নেওয়ার ইতিহাস তো আমাদের অতি পরিচিত।

এই কয়েক হাজার বছরের বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বাঙ্গালির বিয়ের বিধি বিধান লোক লৌকিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
প্রাক-আর্য যুগে যে সমাজ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তা আর্য শাসনের কয়েকশো বছরের মধ্যে অনেক কিছুই বদলে যায়। বিয়ের রীতিনীতিও তার মধ্যে সামিল। নতুন সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক বর্ণাশ্রম প্রথার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠল। বাঙ্গালির বিয়ের লৌকিকতার বিভিন্ন ধরণ জাতি ও বর্ণ ভেদের প্রভাবে গড়ে উঠলো।

মোটামুটি দশ একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙ্গালির সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে কোনো লেখা পাওয়া যায় না , যেখানে বাঙালির বিবাহপ্রথা নিয়ে কোনো উল্লেখ আছে। দশ-একাদশ শতাব্দী থেকে স্মৃতি ও পুরাণকার দের রচনা থেকে যে বিবাহপ্রথা নিয়ে যা তথ্য পাওয়া যায় তা আর্যদের প্রবর্তিত বর্ণবিন্যাসের কাঠামোয় বাঁধা। ধরে নেওয়া যেতে পারে এই সময় থেকে বর্ণহিন্দুদের মধ্যে আর্যবিবাহ প্রথারই প্রচলন হয়েছিল।

আর্যরা যখন ভূমিপুত্র অনার্যদের হারিয়ে নিজেদের শাসন কায়েম করতে আরম্ভ করে তখন থেকেই এ দেশে প্রচলিত বিবাহ ব্যবস্থারও সংস্কার আরম্ভ করে। অনার্যরা তখন নিজেদের ধ্যান ধারনা মত নারী পুরুষের সম্পর্ক মেনে চলতেন। আর্যরা এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাইলেন। তারা নিয়ম করলেন আর্যরা আর্যকন্যাদের বিবাহ করবে এবং চাইলে ধর্মান্তরিত আর্যকন্যাদের বিবাহ করতে পারবে। কিন্তু অনার্যরা কিছুতেই আর্যকন্যাদের বিবাহ করতে পারবে না। অনার্য দের আর্য হয়ে ওঠার স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে বর্ণভেদ প্রথা চালু করা হয়। গায়ের রঙের বিচারে প্রথমে তিন রকমের শ্রেণীবিভাগ করা হয়। পুরোহিত, রাজন্য আর বৈশ্য। পরে তার সঙ্গে ক্ষত্রিয় যোগ হয়।

মোটামুটি গুপ্ত যুগ থেকে বাঙ্গালি সমাজ উত্তর ভারতীয় আর্য –ব্রাহ্মণ্য বর্ণব্যবস্থা মেনে নেয়। কিন্তু সেটা যে খুব মসৃণ ভাবে হয়ে গেছে তা নয়। ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ শ্রেণীর মধ্যে কখনো সংঘাত কখনো আপোষের পথ পার হয়ে একটা জায়গায় পৌঁছনো যায়। পরবর্তী কালে ধর্মগুরুরা বহু আলোচনা করে বিবাহের প্রকার ভেদ করেন আবার বিবাহের পদ্ধতি এবং প্রথাকে শ্রেণী বিভাগও করলেন। আট প্রকারে বিবাহের শ্রেণী বিন্যাস করা হল সে গুলি হল –ব্রাহ্ম , দৈব , আর্য ,প্রজাপত্য আসুর , গান্ধর্ব , রাক্ষস ও পৈশাচ।

শ্রেণী বিন্যাসের ব্যাখ্যা গুলি এই রকম ১) যে বিবাহ বরের কূল, বিদ্যা, স্বভাব, যোগ্যতা ইত্যাদি দেখে দেওয়া হত তা হল ব্রাহ্ম বিবাহ ২) বিবাহ যজ্ঞে পুরোহিতকে কন্যাদান করে যে বিবাহ হত তা হল দৈব বিবাহ ৩) বরের কাছ থেকে গো-মিথুন রূপ শুল্ক নিয়ে যে বিবাহ হত তার নাম আর্য বিবাহ ৪) বর কে ধন সম্পত্তি দিয়ে আকৃষ্ট করে যে বিবাহ তা হল প্রজাপত্য বিবাহ ৫) কন্যা ক্রয় বা জোর করে কন্যার মত আদায় করে যে বিবাহ তা হল আসুর বিবাহ ৬) বর ও কনের মত অনুসারে বিবাহ হল গান্ধর্ব বিবাহ ৭) বল পূর্বক কন্যাকে হরণ করে যে বিবাহ তা হল রাক্ষস বিবাহ ৮) নিদ্রিত বা অসতর্ক অবস্থায় কন্যাকে রমণ করে যে বিবাহ তা হল পৈশাচ বিবাহ।পরবর্তীকালে আট রকমের বিবাহের মধ্যে অবশ্য ব্রাহ্ম এবং গন্ধর্ব বিবাহের প্রচলন রয়ে গেছলো।

এ ছাড়া বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় নানা রকমের বিধি নিষেধের আরোপ করা হয়। বল্লাল সেন এবং লক্ষন সেনের আমলে কৌলীন্য প্রথা নিয়ে নানা রকমের জটিলতা সৃষ্টি হয়। এখান থেকেই কুলীনদের দের বহুবিবাহ , অনূঢ়া কন্যার বিবাহ সমস্যা , বৃদ্ধ কুলীনদের হাতে কন্যা সমর্পণ এবং তা থেকে বিধবা কন্যার সংখ্যা প্রচণ্ড বৃদ্ধি , এই সব সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার রেশ উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত চলে। কুলীন মর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার নামে কুলীন পুরুষদের সাথে শ্রোত্রিয় বা অকুলীন মহিলাদের বিয়ে দেওয়া হতো। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কুলীনদের মাঝে বিয়ের ব্যবস্থা একটি লাভজনক কর্মে পরিণত হয়। কুলীন মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে একজন বয়স্ক পুরুষের সাথে অল্পবয়সী নারীকে যেমন বিয়ে দেওয়া হতো, তেমনি অল্প বয়স্ক একজন পুরুষের সাথে বিয়ে দেওয়া হতো বয়স্কা একজন মহিলার। তারপরও অনেক কুলীন নারী সারাজীবন অবিবাহিতই থেকে যেত। এ ঘৃণ্য প্রথা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলে ছিল।

যার ফলে কুলীন কন্যাদের বিয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সমাজে অল্প বয়সী বিধবাতে ছেয়ে যায়। এর অনিবার্য ফল স্বরূপ সমাজে দুর্নীতি ব্যভিচার ঢুকে পড়ে।

এ রকম একটা সময়ে সমাজের সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন রাজা রামমোহন রায় , ডিরোজিও , কেশবচন্দ্র সেন , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , স্বামী বিবেকানন্দ। এঁদের আন্দোলনে অনেক পরিবর্তন ঘটে। কুসংস্কার কমে আসতে থাকে।

কিন্তু তবুও বর্ণাশ্রম প্রথাকে সমাজ তখনো আঁকড়ে থাকে। এমন কী প্রগতিবাদীদের মধ্যে এই ব্যাপারে তেমন উদারতা দেখা যায় না। কেশব চন্দ্রের কন্যা সুনীতি দেবীর দেবীর কুচবিহারের রাজপরিবারে বিয়ে করা নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজেই ফাটল ধরে যায়। দেবেন্দ্রনাথের দৌহিত্র জ্যোৎস্না নাথ ঘোষাল অসবর্ণ বিবাহে দেবেন্দ্রনাথ মর্মাহত হয়েছিলেন।ঠাকুর বাড়ির সব বিবাহই বর্ণাশ্রম প্রথা মেনেই হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজে এবং তাঁর কন্যাদের বিয়েও এই পারিবারিক প্রথা মেনেই দেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় বর্ধমানের রাণী বিধবা বসন্তকুমারী কে বিয়ে করায় বঙ্গদেশে তুমুল হৈ চৈ হয়েছিল।বিদ্যাসাগর মশাইকে বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করতে গিয়ে সমাজের প্রবল বিরুদ্ধাচরণের মোকাবিলা করতে হয়। আমাদের আধুনিক সমাজ থেকে বর্ণাশ্রম প্রথা যে আজ একেবারেই নির্মূল হয়ে গেছে তেমন ভাবার কোনো কারণ নেই। রবিবারের কাগজে পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন গুলো দেখলে বোঝা যায় যে বেশির ভাগ মানুষই এখন তাদের সন্তানদের বিয়ের জন্যে জাত পাত কূল বংশ , ঠিকুজি , কোষ্ঠী মেনেই দিতে চান।

আসলে ধর্মীয় বিশ্বাসে বিবাহ জীবনের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি কন্যার বিয়ের মধ্যে দিয়ে তার কুল সম্পর্ক ছিন্ন হয় , এবং গোত্রান্তর হয়ে নতুন কুলসম্পর্ক সূচিত হয়। সেই জন্যে একটি মেয়ের জীবনে এটি একটি পরম সন্ধিক্ষণ। তাই কন্যা পক্ষের সবাই চায় এই সময় সব অনুষ্ঠানের নিয়মে যেন কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি না ঘটে। যাতে তার ভবিষ্যৎ জীবন মঙ্গলময় হয়। এ ব্যাপারে একজন স্বধর্মে বিশ্বাস রাখা সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চায় না ।

সন্তানদের বিয়ে দেবার সময় বেশির ভাগ মানুষ আজও আরেকটি জায়গায় অন্য সব বৈজ্ঞানিক যুক্তি ভুলে গিয়ে পরম্পরাকেই গুরুত্ব দেন, সেটা হল পঞ্জিকার নির্দেশ।
কৌলীন্য প্রথা প্রচলনের আগের থেকেই বাঙ্গালির বিয়ের ব্যাপারে পঞ্জিকার শাসন চলত । তবে সেই সময় একদিকে কৌলীন্য প্রথা আর এক দিকে পঞ্জিকার প্রতাপ এই দুয়ের জাঁতা কলে সাধারণ মানুষদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। আজ হয়ত সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তবু আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে পঞ্জিকার একটি বিশেষ স্থান আজও আছে।

হিন্দুরা মূলত অদৃষ্টবাদী। তাই পঞ্জিকার গুরুত্ব হয়ত কোনোদিনই কমবে না। লগ্ন দিন ক্ষণ নির্দিষ্ট করা এবং যোটক বিচার এই ইন্টারনেটের যুগেও কোনো বিবাহের প্রথম ধাপ। এ জন্যে পাত্র পাত্রীর ঠিকুজী কোষ্ঠী জন্মসময় ইত্যাদির দরকার পড়ে। বিবাহের ব্যাপারের কোষ্ঠীর সপ্তম ঘরটি তাৎপর্যপূর্ণ। পাত্রের সপ্তম ঘরটির উপর পাত্রীর এবং পাত্রীর সপ্তম ঘরটির উপর পাত্রের ভবিষ্যৎ শুভাশুভ নির্ভর করবে এমনটাই পঞ্জিকার নির্দেশ।
বিয়ের শুদ্ধাশুদ্ধ কাল নির্ণয় নানা রকমের পদ্ধতি আছে। এই সব বিচার করার জন্যে আজও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের প্রয়োজন হয়ে থাকে বিয়ের আগে।

মনু বলছেন পাত্রের সঙ্গে পাত্রীর বয়সের ব্যবধান বিশ , চোদ্দো অথবা ষোলো হওয়া বাঞ্ছনীয়। কাম শাস্ত্র বলছে পাত্রীর বয়স পাত্র অপেক্ষা অন্তত: তিন বছরের কম হওয়া উচিত।

এ দেশের আইন অবশ্য এই সব শাস্ত্রের বচন কে উপেক্ষা করে অন্য রকম নিদান দিয়েছে। ১৮৬০ সালে এজ অফ কন্সেন্ট আইনে মেয়েদের নুন্যতম বয়স স্থির করা হয় দশ। ১৮৯২ সনে এই নুন্যতম বয়স বেড়ে দাঁড়ায় বারো। ১৯২৯ সনে এটা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৪। ১৯৫৫ সালে এটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ বছর। সে আইন এখনো লাগু আছে।

বাঙালি জাতি যেহেতু আর্য অনার্যের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে , তাই আর্যদের থেকে কিছু শাস্ত্রীয় পদ্ধতি আর অনার্যদের থেকে কিছু স্ত্রী আচার বাঙালি বিবাহের নিয়মের মধ্যে ঢুকে পড়ে। স্ত্রী আচারের মধ্যে পড়ে অধিবাস, নান্দীমুখ, জল সওয়া, ছাদনাতলা, বাসরঘর, বাসি বিয়ে, বধূবরণ, কালরাত্রি, ভাত-কাপড়, বউভাত, ফুলশয্যা, দ্বিরাগমন ইত্যাদি। যদিও জাতি, বর্ণ , বংশ , অঞ্চল এ সবের সঙ্গে এই সব নিয়মের পরিবর্তন দেখা দেয়।কেও কেও মনে করেন এই সব নিয়মের মধ্যে নানা রকমের প্রতীকী ব্যাপার লুকিয়ে আছে। তার কিছু কিছুর মধ্যে যৌনতাও আছে। আবার কিছুর মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতার ইঙ্গিতও আছে ।বাসি বিয়ের সময় একটি নিয়ম আছে বর একটি শিলের উপর দাঁড়াবে এবং জল অথবা দই দিয়ে তার পা ধুইয়ে দেওয়া হবে। আর একটি অনুষ্ঠানে বর দাঁড়িয়ে থাকে , কনেকে পিঁড়িতে বসিয়ে বরের চারিদিকে সাতবার ঘোরানো হয়। তার পর তাদের প্রথমে ধ্রুবতারা পরে অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখানো হয়। বৈদিক রীতিতে এটি আসল মানে বর কনেকে দেখিয়ে বলবে আমি ধ্রুবতারা আর তার কাছে যেমন একটি ছোট্টো নক্ষত্র অরুন্ধতীর মত সর্বদা তার সঙ্গে থাকে তুমিও সর্বদা আমার সঙ্গেই থাকবে ।

সিঁদুরদান বাঙালি বিয়ের একটি অপরিহার্য অনুষ্ঠান। হোম হয়ে যাবার পর বর আংটি দিয়ে , কুনকের পিঠ দিয়ে অথবা শাঁখের উলটো দিক দিয়ে কনের সীমন্তে সিঁদুর পরিয়ে দেন। কিন্তু এটি ঠিক আর্য প্রথা নয়। আদিবাসীদের মধ্যে লাল রঙ সৌভাগ্য এবং বিজয়ের প্রতীক। সাঁওতাল ও মুন্ডা গোষ্ঠীর দের মধ্যে বিয়ের সময় সিঁদুর দানের প্রচলন ছিল। সেখান থেকেই হয়ত এই প্রথা আমাদের মধ্যে চলে আসে। প্রাচীন হিন্দু সমাজে সিঁদুরের প্রচলন ছিল না। লাল রঙের জন্যে রক্ত চন্দন ও কুমকুমের ব্যাবহার হত।
তেমনি শাঁখা ও নোয়া পরার কোনো আর্য স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। অনেক পণ্ডিত মনে করেন এগুলি দাসত্বের বা বন্দিত্বের প্রতীক।

হিন্দু বাঙ্গালির বিয়েতে নাপিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। হিন্দুদের বিশ্বাস নাপিতের দ্বারা নখ চুল না কাটলে শুদ্ধ হওয়া যায় না।ছাদনাতলার অনুষ্ঠানে নাপিতের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। বিয়ে চলাকালীন নাপিতকে দেখা যায় নানারকমের ছড়া কেটে গৌরবচন পাঠ করতে।
যেমন –

শুন সবে , এবে আমি করি নিবেদন।
ছাঁদনা তলায় এসেছে বর বৃষভবাহন।।
মন্দলোক থাক যদি ,যাও সরে যাও
ছাউনি নাড়ার সময় হল এয়োরা দাঁড়াও।।
এই রকমের ছড়া কেটে উপস্থিত সবাইকার কিছুটা মনোরঞ্জন করে।

বাঙালি হিন্দুদের বিয়েতে বরকে আংটি দিতে হয়। বিয়ের আংটিটি যাতে নিখুঁত গোল হয় সেদিকে লক্ষ রাখা হয়। কারণ গোলাকার পবিত্রতার প্রতীক।বাঁ হাতের চতুর্থ আঙ্গুলে আংটি পরানো হয় কারণ ওখানে থেকেই নাকি রক্তের শিরা গিয়ে হৃৎপিণ্ডে মিশেছে।মানে হৃদয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।

এর পর চাদরের তলায় যে শুভদৃষ্টি হয় , তার কোনো মন্ত্র নেই। কারণ এটি একটি স্ত্রী আচার। এর পরে মালা বদলও তাই।

বিয়ের সময় যে উলু ধ্বনি করা হয় সেটিও একটি অনার্য প্রথা।সাধারণত ভুত প্রেত তাড়াবার জন্যে এক রকম ধ্বনি ব্যাবহার করত।তার থেকেই উলু ধ্বনি এসেছে।

ছাঁদনা তলায় বরকে কিঞ্চিৎ ragging করার প্রথাও আছে। এর মধ্যে একটি কলা পাতার মাঝ দিয়ে পেটাতে পেটাতে বলা – কড়ি দিয়ে কিনলাম , দড়ি দিয়ে বাঁধলাম ইত্যাদি। এ গুলি সাধারণত বরের শালী , বৌদি স্থানীয় মহিলারাই করে থাকেন। এছাড়া আরো নানারকমের স্ত্রী আচার প্রচলিত আছে।

বাঙালি বরের টোপরটির ডিজাইনটি সম্ভবত যোদ্ধার শিরস্ত্রাণ থেকে এসেছে, আর কনের মুকুট টির ডিজাইনটি এসেছে রানির শিরোভূষণ থেকে।পুরুষমানুষের পক্ষে বিবাহিত জীবন যে একটি যুদ্ধে প্রবেশ করা , সে রকম একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা এর থেকে কেও দিতে পারেন।

বৈদিক যুগে বরের পোশাক ছিল পট্টবস্ত্র। তার পর প্রচলন হয় লাল চেলির জোড়।বৈদিক যুগে কনের সজ্জা ছিল পট্টসূত্রের অন্তর্বাস , নাভি বন্ধ , লাল রঙের বহির্বাস।

আমাদের বিয়ের সব চেয়ে পরিচিত অনুষ্ঠানটির নাম সপ্তপদী। পবিত্র অগ্নিকে সাক্ষী রেখে আগুনের চারপাশে বর-কনেকে সাতপাক ঘোরানো হয়। এই সময়ে যে মন্ত্র পড়া হয় তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী এই সাত পাক সম্পূর্ণ হলেই আইনত বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়। সাতটি পাকের সঙ্গে যে সাতটি মন্ত্র উচ্চারিত করা হয় সে গুলি এই রকম – প্রথম চরণ – “ওঁ ইশে একপদী ভব, সা মামনুব্রতা”। অর্থাৎ, প্রথম চরণ ফেলো, তুমি আমার অনুবর্তিনী হও। দ্বিতীয় চরণ – “ওঁ উর্জে দ্বিপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, দ্বিতীয় চরণ ফেলো, সমস্ত কর্মে আমার অনুবর্তিনী হও। তৃতীয় চরণ – “ওঁ রায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, ধন পুষ্টির জন্য তৃতীয় চরণ ফেলো, এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও। চতুর্থ চরণ – “ওঁ মায়োভব্যায় চতুষ্পদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। সুখ লাভের জন্য তুমি চতুর্থ পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও। পঞ্চম চরণ – “ওঁ প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, পুত্রবতী হওয়ার জন্যে পঞ্চম পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও। ষষ্ঠ চরণ – “ওঁ ব্রতেভ্যঃ ষট্ পদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ সকল ঋতুর জন্যে ষষ্ঠ পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও। সপ্তম চরণ – “ওঁ সখে সপ্তপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, সপ্তম পদ ফেলো, এবং সখ্যতায় তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।

সপ্তপদী গমনের পর পুরোহিত কন্যার কপালে , কণ্ঠে, এবং বক্ষে যজ্ঞের ভস্ম অনুলেপন করবে। বর কন্যার হৃদয়ে কর স্পর্শ করে বলবে –মমব্রতে তে ‘হৃদয়ং দধামি মম চিত্তমনু চিত্তং তে অস্তু।মম বাচমেকমনা জুয়ম্ব প্রজাপ্রতিষ্টুবা নিযুনক্তু মহ্যম।।’ অর্থাৎ আমার ব্রতে তোমার হৃদয় কে স্থাপিত করি , তোমার চিত্ত আমার অনুকূল হোক , একমন হয়ে আমার বাক্য পালন কর, প্রজাপতি তোমাকে আমার জন্যে নিযুক্ত করুন।

মোটামুটি এ ভাবেই বাঙ্গালির বিবাহ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়, এবার শুরু হয় যুগল জীবন যাপন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দু জন অচেনা অজানা মানুষ একটি নতুন জীবনের জন্যে এক সাথে পা ফেলা শুরু করে, সব কর্মে, ধন উপার্জনে, সুখের অনুসন্ধানে, সন্তান কামনায়, ব্রত পালনে এবং বন্ধুতায় এক সাথে পথ চলা শুরু করে। সে পথ সব সময় মসৃণ হয় না। ঝড় ঝাপটা আসে। আবার কেটেও যায়। তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়ের মধ্যে প্রেম খেলাঘর গড়ে যায়।এটাই গড়পড়তা বাঙ্গালির দাম্পত্য জীবনের পরম্পরা ছিল।
‘বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিও না।
কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্মবিনাশের পথ
পরিষ্কার করে।‘
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর যে কবিতাটির অংশ উপরে দেওয়া হল সেটির নাম ‘মিলিত মৃত্যু’।বিয়ের সব মন্ত্রে যা বার বার বলা হয় এ কবিতা একেবারে বিপরীত কথা বলে। কবিরা শুধু মোহাবিষ্টই করে না। মোহোমুদ্গরের আঘাতে আমাদের ভেসে বেড়ানো মন কে কঠিন মাটিতে নামিয়েও আনেন।ভিন্ন পরিবার , ভিন্ন পরিবেশ কখনো বা ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা দু জন স্বাধীনচেতা মানুষের যুগ্ম জীবন যে সব সময় ঠিক একই পর্দায় বাঁধা থাকবে এমনটা আশা না করাই ভালো। কিন্তু আধুনিক জীবনে আমরা বিয়ের সময় সেই ‘যে যার রঙ্গে বেঁচে থাকা’র কথা আমরা প্রথম দিন থেকেই মেনে নেওয়ার কথা বলব , নাকি সেই চিরকালের ‘যদেতত্‍ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ‘ মন্ত্রোচ্চারণ করেই শুরু হবে আগামী প্রজন্মের যুগলবন্দির আলাপ , সেটা ভবিষ্যতই বলবে।

নারী যবে থেকে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়েছে সমাজে তার ভূমিকা পালটে গেছে , তাই পালটে গেছে বাঙ্গালির দাম্পত্য জীবনও। এই নিবন্ধ শুরু করেছিলাম একটি পঞ্চাশ বছর আগেকার সিনেমার উল্লেখ করে। শেষ করি আর একটি সাম্প্রতিক সিনেমার কথা বলে , কাড়ন সিনেমা সাহিত্যের মতই সমাজের পরিবর্তন টি ধরার চেষ্টা করে। খুব সম্প্রতি একটি হিন্দি ছবিতে ( Ki and Ka ) দেখা গেছে নারী ও পুরুষের role reversal এর গল্প। মানে এ ছবির নায়িকাকে একজন চাকুরীরতা মহিলা এবং নায়ককে একজন house-husband হিসেবে দেখা গেছে। এ গল্পের মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত লুকানো আছে কিনা জানি না। তবে জীবন যাপনে যা সম্ভব নয় সেই সব মন্ত্র এবং অনুষ্ঠান , শুধু ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে আমরা বিবাহ অনুষ্ঠানে রেখে দেবো কিনা সেটা ভাবনার বিষয়। শেষ করার আগে মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি আমি বাঙালি বিবাহ বলে শুধু হিন্দু বাঙ্গালির কথাই এই নিবন্ধে বলেছি। মুসলমান , বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, ব্রাহ্ম বাঙ্গালিদের কথা বলতে পারিনি , এই নিবন্ধের শব্দ সংখ্যা সীমিত রাখার জন্যে।পরে এ বিষয়ে লেখায় ইচ্ছে রইল।
আত্মপক্ষ –
এই নিবন্ধে ইতিহাস ,পুরাণ ,উপনিষদ বেদ , মনু ইত্যাদিতে আছে বলে যে সমস্ত প্রথা , রীতিনীতি, বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে তা সবই তিনটি গ্রন্থর উপর নির্ভর করে লেখা। সেগুলি হল –
১) বাঙ্গালির ইতিহাস – সুভাষ মুখোপাধ্যায়
২) ভারতীয় বিবাহের ইতিহাস – অতুল সুর
৩) বাঙালি জীবনে বিবাহ – শঙ্কর সেনগুপ্ত

প্রথমটি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখিত হলেও এটি আসলে – ‘সংক্ষেপে ডক্টর নীহার-রঞ্জন রায়-এর বাঙ্গালির ইতিহাস। আদিপর্ব’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং ভূমিকা স্বয়ং নীহাররঞ্জন রায় মহাশয়ের লেখা।

অতুল সুর মহাশয়ের একজন খ্যাতনামা নৃতত্ববিদ এবং ঐতিহাসিক , যাঁর সম্বন্ধে ড. নীহারঞ্জন রায় এর মূল্যায়ন “আমাদের সমপর্যায়ের লোক হয়েও আপনার পাণ্ডিত্যের অভিমান নেই, নীরবে বাঙলাদেশ ও বাঙালীর ইতিহাস আপনি উদ্ঘাটিত করে চলেছেন। আপনি আমার মত অনেকেরই শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন, আপনার কর্মের দ্বারা।”

শঙ্কর সেনগুপ্ত মহাশয় ইতিহাস ও সমাজতত্ব নিয়ে বেশ কয়েকটি মূল্যবান বই লিখেছেন। এর মধ্যে মধ্যে – ‘এ সার্ভে অব ওম্যান ইন বেঙ্গল’ বইটি রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত।

আমি শাস্ত্রজ্ঞ বা গবেষক নই। নেহাতই একজন কৌতূহলী পাঠক। যে বিষয়টিকে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে ধরার চেষ্টা করেছি তা ভালো ভাবে বুঝতে গেলে আরো অনেক গবেষণা দাবী করে। তবে আমাদের শাস্ত্র এতটাই বিরাট যে আমি দেখেছি দুজন শাস্ত্রজ্ঞ একই শাস্ত্র সম্বন্ধে কদাচিৎ একমত হন। এমনকি দেখা গেছে একই লেখক বিভিন্ন জায়গায় পরস্পর বিরোধী মন্তব্যও করেছেন। তাই এই নিবন্ধ প্রকাশিত মতামত নিয়েও অনেকে ভিন্ন মত পোষণ করতেই পারেন।

লেখক পরিচিতি – সোমেন দে,চাকুরী জীবন বেসরকারি এবং আধা সরকারি কর্পোরেট জগতের বিভিন্ন পদে। এখন অবসরপ্রাপ্ত। লেখেন নেহাতই মনের খিদে মেটাতে। লেখেন নানান বিষয় নিয়ে। তবে যাই লেখেন বিষয় নির্বাচনে কিছু অভিনবত্ব থাকে। গান , চলচ্চিত্র, ভ্রমণ, দিন বদলের ছবি, বাঙ্গালিয়ানা এ রকম আরও অনেক বিষয় এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। তথ্যকে কৌতুকের মোড়কে এবং ভাবনা কে স্বচ্ছতার আবরণে পরিবেশন করতে চেষ্টা করেন। বিষয় যাই হোক ভাষা সব সময়েই ঝরঝরে, রসস্নিগ্ধ এবং মনোগ্রাহী। বেশ কয়েকটি ওয়েব পত্রিকাতে লেখেন। দেশ বিদেশে অনেক গুণগ্রাহী পাঠক আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here