লোকসংস্কৃতি : সংজ্ঞা-স্বরূপ ও শ্রেণীবিভাগ

0
9

বাঙালি সংস্কৃতিঃ
সংস্কৃতি বলতে যা বুঝায়, লোকসংস্কৃতি তারই একটি অংশ- সংস্কৃতির একটি বিশিষ্ট রূপ। মানুষের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, মন-মানসিকতা এবং জীবন লক্ষের চেতনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জীবনবোধ এবং তারই প্রকাশ সংস্কৃতি। কেবলমাত্র সাহিত্য বা শিল্পকলার মধ্যেই সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃতি গোটা জীবন পরিব্যাপ্ত। ‘সংস্কৃতি’শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘কালচার’|ইংরেজি সাহিত্যে কালচার কথাটার প্রথম ব্যবহার করেন ফ্রান্সিস বেকন ষোল শতকের শেষভাগে। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের কাজ যেখানে প্রকৃতির প্রতি অনুগত থেকেই প্রকৃতিকে জয় করা, সেখানে শিল্প-কাব্য-সাহিত্য তথা কালচারের লক্ষ সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন দ্বারা মানবমনকে প্রকৃতির যান্ত্রিক বন্ধন থেকে মুক্ত করা সৃজনশীল মার্জিত জীবনের সন্ধান দেয়া। কর্ষণ (কালটিভেশণ) বা চাষবাসের মাধ্যমে একটা জমিকে যেভাবে ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে তোলা হয়, তেমনি কৃষ্টি বা সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষের অপরিশীলিত চিন্তা-ভাবনা ও আচার-আচরণকে পরিশীলিত এবং সত্য-সুন্দর-কল্যাণের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, ‘উদ্ভিদের পক্ষে কর্ষণ যাহা, মানুষের পক্ষে স্বীয় বৃত্তিগুলির অনুশীলন তাহাই। এ জন্য ইংরেজিতে উভয়ের নাম ‘কালচার’।
প্রসেফর জিল্লুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেশী ডিকশনারী-তে ‘কালচার’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে- সংস্কৃতি, কৃষ্টি, মানব সমাজের মানসিক বিকাশের প্রমাণ। একটি জাতির মানসিক বিকাশের অবস্থা। কোনো জাতির বিশেষ ধরনের মানসিক বিকাশ। কোনো জাতির বৈশিষ্ট্যসূচক শিল্প সাহিত্য, বিশ্বাস, সমাজনীতি। কলকাতার ‘সাহিত্য সংসদ’ প্রকাশিত অশোক রায়ের ‘সমার্থ শব্দকোষে’’ ‘সংস্কৃতির সমার্থ শব্দগুলো লিখেছেন- কালচার, কৃষ্টি, তমদ্দুন, মার্জনা, পরিশীলন, পরিমার্জন, অনুশীলন, সভ্যতা, শিষ্টতা, রুচিশীলতা, রুচি, সুরুচি।
সমাজ বিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, পণ্ডিতেরা এই ‘কালচার’বা ‘সংস্কৃতির বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। ফ্রান্সিস বেকন থেকে শুরু করে ম্যাথু আর্নল্ড, ইমারসন প্রমুখ পাশ্চাত্যে এবং বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতির সংজ্ঞার্থ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতামতে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে তাঁরা সবাই ছিলেন একমত, আর সেটি হলো এই যে, সংস্কৃতি মাত্রই সর্বতোভাবে একটি অন্তর্লোকের ব্যাপার-সংস্কৃতি মানে মানসিক অনুশীলন, সুরুচি ও শিষ্টাচারের চর্চা। তবে এ অর্থে সংস্কৃতির উৎপত্তি যদিও ব্যক্তিগত সুরুচি ও শিষ্টাচারে, এর বহিঃপ্রকাশ ও ব্যাপ্তি ঘটে সঙ্গীতে, কাব্যে, সাহিত্যে, ললিতকলায়, ধর্মে ও দর্শনে।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে এডওয়ার্ড টেইলর তাঁর Primitive Culture’ কালচার’ গ্রন্থে ‘Culture’- এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেটিই বিবেচিত হয় ধ্রুপদী সংজ্ঞা বলে। এডওয়ার্ড টেইলর বলেছেন-
`Culture is that complete whole which includes knowledge, belief, art, moral law, custom and other capabilities and habits acquired by man as a member of the society’- – টেইলরের এই সংজ্ঞার আলোকে গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বিশ্বাস, আচার-আচরণ এবং জ্ঞানের একটি সমন্বিত প্যাটার্ণকে বলা হয় সংস্কৃতি। ভাষা, সাহিত্য, ধারণা, ধর্ম ও বিশ্বাস, রীতিনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়ম কানুন, উৎসব-পার্বণ, শিল্পকর্ম এবং প্রতিদিনের কাজে লাগে এমন হাতিয়ার ইত্যাদি সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যেসব শিক্ষা, সামর্থ এবং অভ্যাস আয়ত্ত করে-তাও সংস্কৃতির অঙ্গ।*১ (১. গোলাম মুরশিদ : হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি,পুনর্মুদ্রণ, ডিসেম্বর-২০১০, পৃ-১৩)
‘সংস্কৃতি’ শব্দটি উঁচু শ্রেণীর বৌদ্ধিক পারদর্শিতা এবং আত্মিক শুদ্ধির প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। সে কারণেই একজন সংস্কৃতিবান মানুষ বলতে আমরা শিক্ষিত, পরিশীলিত, নান্দনিক প্রজ্ঞাসমপন্ন সুচারু ও ভদ্র কোনো ব্যক্তিকে নির্দেশ করি। কিন্তু ‘সংস্কৃতি’ বলতে আবার জীবনচর্চার একটি প্রক্রিয়াও নির্দেশিত হয়, মানুষ নিজের জীবনে যার ব্যবহারিক চর্চা করে থাকে। সমগ্র জীবন দর্শন হিসেবে সংস্কৃতির পদ্ধতিগুলি শিক্ষা ও সূক্ষ্ম বোধের অগ্নিতে পরিশুদ্ধ হয়ে স্ফটিকের চেহারা ধারণ করে। সে জন্য যে দেশে অধিক সংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তি, লেখক, বিজ্ঞানী, স্থপতি- এসব শ্রেণীর মানুষ বেশি সংখ্যায় বসবাস করেন, সে দেশের সংস্কৃতিকে খুব উচ্চশ্রেণীর বলে ধরা হয়। সংস্কৃতি চর্চার উপাদান এবং দেশকাল ভেদের কারণে, বিভিন্ন শ্রেণী ও সমাজের মানুষের সংস্কৃতিও ভিন্ন হয় এবং বিভিন্ন নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন- ‘উচ্চশ্রেণীর সংস্কৃতি’ ও ‘নিম্নশ্রেণীর সংস্কৃতি’, ‘লেখ্য সংস্কৃতি’ ও ‘কথ্য সংস্কৃতি’, ‘গ্রামীণ সংস্কৃতি’ ও ‘নাগরিক সংস্কৃতি’, ‘ধ্রুপদী সংস্কৃতি’ ও ‘লোকসংস্কৃতি’ ইত্যাদি।

সংস্কৃতির বিকাশ সাধিত হয় এতিহ্যের মধ্য দিয়ে। ঐতিহ্য ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশ হয় সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের জীবনচর্চার নিয়ম ও জীবনচর্চার ফসল একত্রে সংস্কৃতির বুনিয়াদ গড়ে তোলে। সংস্কৃতি ঐতিহ্যবাহী কিন্তু ইতিহাসনিষ্ঠ নয়। ঐতিহ্যের অনেক উপকরণই সংস্কৃতির মধ্যে সঞ্চারমান। কিন্তু সব উপাদানই সকল সময় বিরাজমান থাকে না। নদী যেমন চলতে চলতে অনেক বাঁক নেয়, সংস্কৃতির প্রবাহেও থাকে এমন বাঁক। ক্রমোৎকর্ষ বৈশিষ্টের গুণে সংস্কৃতি রূপান্তরিত ও বিবর্তিত হতে থাকে। নতুনের স্বাচ্ছন্দতায় পুরাতনের বন্ধন ছিন্ন হয়। সংস্কৃতির ধারা বেগবান রূপলাভ করে। সংস্কৃতি বিকাশ ও প্রকাশ কতকগুলি অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন-ভৌগোলিক পরিবেশ, প্রকৃতির অবদান, ধর্মীয় বিধি-বিধান, সামাজিক রীতিনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক তথা পারিপার্শ্বিক প্রভাব এবং প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা সংস্কৃতি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিরুপিত হয়। মানুষের জীবনের লক্ষ্য হল পারিপার্শ্বিকতার সাথে সামঞ্জস্য বিধান। প্রকৃতিলোকের সাথে মানবলোকের আত্মার সম্পর্ক না হলে সংস্কৃতি দূরের কথা জাতির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হবে।
সংস্কৃতির বিকাশের ধারায় তাকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা-
১. আদিম সংস্কৃতি
২. লোকসংস্কৃতি
৩. নগর সংস্কৃতি।
আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘লোকসংস্কৃতি’। সমাজের সাধারণ মানুষের যে সংস্কৃতি তা-ই সাধারণভাবে ‘লোকসংস্কৃতি’ নামে পরিচিত। তবে সূক্ষ্ম বিচারে লোকসংস্কৃতির অর্থ এবং এর জগৎ বিচিত্র ও ব্যাপক। লোকবিজ্ঞানীদের অনেকে ইংরেজি ‘ফোকলোর’ Folklore- এর প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় ‘লোকসংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইংরেজি ‘ফোক’(Folk) এবং ‘লোর’ (Lore) শব্দ দুটির সমন্বয়ে ‘ফোকলোর’ (Folklore) শব্দটি গঠিত। ‘ফোক’(Folk) অর্থ-লোক, জনসাধারণ, সাধারণ মানুষ, জাতি ইত্যাদি; আর ‘লোর’(lore) অর্থ- ঐতিহ্যগত শিক্ষা, বিদ্যা, উপদেশ, জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ইত্যাদি। সে বিবেচনায় ‘ফোকলোর’ এর অর্থ দাঁড়ায় লোক তথা সাধারণ জনগণের ঐতিহ্যগত শিক্ষা, বিদ্যা, উপদেশ, জ্ঞান, পা-িত্য ইত্যাদি। ইংল্যাণ্ডের ঐতিহ্য সচেতন পন্ডিত উইলিয়াম থমস্ ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘গ্রামীণ অশিক্ষিত জনগণের সংস্কৃতি’কে বুঝানোর জন্য প্রথম ‘ফোক’(Folk) ও ‘লোর’(lore) শব্দ দুটিকে একত্রিত করে ‘ফোক-লোর’ (Folklore) শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে শব্দ দুটি একত্রীকরণের ক্ষেত্রে হাইফেন পরিহার করে ‘ফোকলোর’(Folklore) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বিগত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত এই ‘ফোকলোর’(Folklore) বলতে ‘গ্রামীণ অশিক্ষিত জনগণের সংস্কৃতি’কে বোঝানো হত। পরবর্তীতে ফিনল্যা-, আমেরিকা, সুইডেন, জার্মান প্রভৃতি দেশে ‘ফোকলোর’ (Folklore) সম্পর্কে আধুনিক ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে এর বিষয়বস্তু এবং পরিধি হয়েছে ব্যাপক ও বিস্তৃত। বর্তমানে কেবল গ্রামীন কৃষি সমাজের অশিক্ষিত জনগণের নয়; সমাজের সকল ক্ষেত্রের অর্থাৎ গ্রাম এমনকি শহরের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে এ সম্পর্কিত জ্ঞানচর্চা বা বিদ্যাশাখাকে (disciplne) ) বুঝাতেও ‘ফোকলোর’ (Folklore) শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
পণ্ডিতেরা ‘ফোকলোর’ শব্দটির বাংলায় নানা প্রতিশব্দের কথা বলেছেন। যেমন-
১. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় – লোকযান
২. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ -লোকবিজ্ঞান
৩. ড. সুকুমার সেন -লোকচর্যা
৪. ড. বাসুদেব আগরওয়াল -লোকবার্তা
৫. রামনরেশ ত্রিপাঠি – গ্রাম্য সাহিত্য
৬. কেশরী নারায়ণ শুক্ল – লোকবাক্সময়
৭. রমাপ্রসাদ চন্দ্র -লোকবিদ্যা
৮. শঙ্কর সেনগুপ্ত -লোকবৃত্ত
৯. ড. কৃষ্ণদেব উপাধ্যায় -লোকসংস্কৃতি
১০. ড. আশুতোষ -লোকশ্রুতি
১১. ড. আশরাফ সিদ্দিকী -লোকসংস্কৃতি
১২. ড. মাযহারুল ইসলাম -লোকলোর
১৩. ড. তুষার চট্টোপাধ্যায় -লোককৃতি
১৪. ড. ওয়াকিল আহমদ) -লোককলা
১৫. শামসুজ্জামান খান – ফোকলোর *২
(*২. ড. মুহম্মদ আব্দুল জলিল : বাংরাদেশের ফোকলোর চর্চার ইতিবৃত্ত, অনার্য-২০১১, পৃ-২৪)
তবে, বাংলায় ‘ফোকলোর’ এর প্রতিশব্দ বা পরিভাষা হিসেবে ‘লোকসংস্কৃতি’ শব্দটিই বেশি প্রচলিত হয়েছে।

অপরদিকে, পণ্ডিতেরা নানা সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে ফোকলোর-এর স্বরূপ নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। যেমন- বান বেন অ্যামোস ফোকলোর এর সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন এভাবে- ‘লোকসংস্কৃতি একটি ছোট গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ শিল্পিত সংযোগ’ (Folklore is an artistic communication in small groups).*3 (*3. Ben Amos, Dan : Towards a Definition of Folklore in Context. Journal of American Folklore-1971).

শামসুজ্জামান খান এই সংজ্ঞাটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন- মানুষের নান্দনিক চেতনা ও অনুভূতি এবং কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটে আদান-প্রদানের মাধ্যমে। এই আদান-প্রদান অর্থবহ হয়ে ওঠে প্রদায়ী ও গ্রহীতা পরস্পরের ওপর ক্রিয়াশীল হয় বলেই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে এই পারস্পরিক ক্রিয়াকে গভীরভাবে ‘অনুসন্ধান’ করাই ফোকলোরের কাজ।*৪ (*৪শামসুজ্জামান খান : ফোকরোর চর্চার সাম্প্রতিক প্রবণতা, প্রবন্ধ : সংবাদ সাময়িকিী, ঢাকা, ৩১ আষাঢ়, ১৪০০ বঙ্গাব্দ।

ড. ওয়াকিল আহমদ এর মতে-‘একটি সংহত সমাজের মানুষ পুর্ব পুরুষের কাছ থেকে মুখে মুখে বা হাতে করমেলব্ধ জ্ঞানের এবং স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে ঐতিহ্য নির্ভর যা কিছু সৃষ্টি করে, তাকেই লোককলা বলা হয়।৫* (*৫. ওয়াকিল আহমদ : লোককলা তত্ব ও স্বরূপ সন্ধান, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৯)।

ড. মযহারুল ইসলাম ফোকলোরের সামগ্রিক বিষয় বিশ্লেষণ করে বলেছেন-‘লোকসংস্কৃতি (ফোকলোর) বলতে আমরা একদিকে যেমন জনগণের পরিচালিত সৃষ্টি বা ঐতিহ্যকে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি, অন্যদিকে তেমনি জনজীবনের ব্যাপক পরিধিকেওÑযার মধ্যে রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, পোশাক পরিচ্ছদ, উৎসব-পার্বণ, খেলাধূলা ইত্যাদিকে অন্তর্ভূক্ত করা চলে। সমাজ বিজ্ঞানী ও নৃতত্ববিদদের মতে অবশ্য লোকসংস্কৃতি আরো ব্যাপক অর্থাৎ- জনজীবনের ও সমাজের সামগ্রিক জীবনাচারণ, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের বিচিত্র জীবনের সামগ্রিক প্রতিফলন ঘটে লোকসংস্কৃতিতে।৬* (*৬. মযহারুল ইসলাম : ফোকলোর পরিচিতি ও পঠন-পাঠন, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩)।
১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রয়ারি মাসে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্যারিস বৈঠকে ২২টি দেশের ফোকলোর বিশেষজ্ঞ দ্বারা গৃহীত ‘ফোকলোর’-এর বিজ্ঞানভিত্তিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- `Folklore is a group oriented and based Creation or groups or indivituals reflecting the expectations of the community as an adequate expression of its cultural and social identity, its standereds and values are transmitted orraly, by initiation or by other means. It forms include, among other,language, liturature, music, fance, games, mythology, rituals, customs, handicrafts, archeteacture and other arts.’7* ( *৭. নমিতা ম-ল : লোকসংস্কৃতি : সংজ্ঞা ও পরিভাষা সন্ধান, প্রবন্ধ, লোকসংস্কৃতি, জুলাই-১৯৯৯, বাঁকুড়া লোকসংস্কৃতি একাডেমী।)

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে- লোকসংস্কৃতি হচ্ছে গ্রামীণ ও শহুরে সমাজের ঐতিহ্যগতভাবে সৃষ্ট চিন্তা, বাক্ ও ব্যবহারিক চর্চার বহিঃপ্রকাশ এবং সামগ্রিক জীবন প্রবাহের প্রতিফলন। অন্যভাবে বলা যায়, ঐতিহ্যনুসারী বৃহত্তর জনগোষ্টীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও অনুষ্ঠান, জীবন-যাপন প্রণালী, শিল্প ও বিনোদন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সংস্কৃতিকেই সহজ ভাষায় লোকসংস্কৃতি বলা হয়। আর সমাজে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের ঐতিহ্যগত বিশ্বাস, সংস্কার, চিন্তা, দর্শন, ধর্মীয়চেতনা, আচার-আচরণ, জীবন-জীবিকা, পেশা, খাদ্যাভাস, বাসস্থান, পোষাক-পরিচ্ছদ, চিত্তবিনোদন, উৎসব, পর্ব, পার্বণ, অনুষ্ঠানাদি সব মিলে সুদীর্ঘকালে গড়ে ওঠা সামগ্রিক জীবনযাপন পদ্ধতি এবং তাদের ব্যবহারিক প্রয়োজনের তাগিদ ও স্বভাবজাত সৌন্দর্যবোধ ও নান্দনিক চেতনাপ্রসূত বস্তুগত ও অবস্তুগত সৃষ্টিসম্ভার (অর্থাৎ-লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, লোকিশিল্প) ইত্যাদি বিচিত্র উপাদানে সজ্জ্বিত লোকসংস্কৃতির ‘সাতনরীহার’।
লোকসংস্কৃতি বহু ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলোকে চারটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যেতে পারে : যেমন-

১. বস্তুগত, (material),
২. মানসজাত (formal),
৩. অনুষ্ঠানমূলক (functional) এবং
৪. প্রদর্শনমূলক (performing)।

ড. মযহারুল ইসলাম গঠন প্রকৃতি, মেজাজ ও চারিত্র বিবেচনায় ফোকলোরকে- ১. বস্তুগত (material) ও ২. মানসজাত (formal) এই দুটি বিভাগে ভাগ করে উভয় বিভাগের অনেকগুলো উপ-বিভাগ নির্দেশ করেছেন এবং সেই সব উপ-বিভাগকে আবার ৫টি সুসংহত গুচ্ছে বিন্যস্ত করেছেন।

এগুলো হচ্ছে-
ক. বাক্ কেন্দ্রিক,
খ. অঙ্গভঙ্গি কেন্দ্রিক,
গ. আচার-ব্যবহারগত,
ঘ. খেলাধূলা কেন্দ্রিক এবং
ঙ. বস্তুকেন্দ্রিক।
আবার ড. তুষার চট্টোপাধ্যায় লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলোকে নিম্নোক্ত ৫টি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন :

১. দৈহিক ক্রিয়াধর্মী (ক্রীড়া, অভিনয়, ইঙ্গিত, নৃত্য ইত্যাদি),
২. শিল্পধর্মী (কারুকর্ম, চারু-শিল্প, গৃহস্থাপত্য-আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, ব্যবহারিক উপকরণ),
৩. বাক্ধর্মী (ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদি),
৪. প্রয়োগধর্মী (মন্ত্র-তন্ত্র, ঝাড়ফুক, চিকিৎসা, ঔষধ-পথ্য, তাবিজ-কবজ) এবং
৫. বিশ্বাস অনুষ্ঠানধর্মী (জাদু-ক্রিয়াচার, পালা-পার্বণ, সংস্কার, পুজা-অর্চনা, উৎসব, মেলা ইত্যাদি) ।

বাংলাদেশের সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন এবং মূলত লোকজ বৈশিষ্টম-িত। বলা যেতে পারে, লোকসংস্কৃতির আকরভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। অপরূপ নৈসর্গিক শোভাম-িত নদীমাতৃক এবং মূলত কৃষিনির্ভর এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুদীর্ঘ কালের পথ-পরিক্রমায় বিকাশ লাভ করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রময় লোকসংস্কৃতি।
মূলত, কোন একটি অঞ্চল বা দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-প্রকৃতির বিন্যাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, অরণ্য-পাহাড়, আবহাওয়ার প্রভাব, জনবসতির ধরণ ও বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, লোকসমাজের সামগ্রিক আচার, বিশ্বাস, সংস্কার, প্রথা, এবং নিরন্তর পরিবর্তনশীল মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনের বৃহৎ পরিম-লের মধ্যে সুদীর্ঘ কাল-পরিক্রমায় গড়ে ওঠে বিচিত্র, বহুমাত্রিক ও অভ্যন্তরীণ গতিশীলতায় ঋদ্ধ লোকসংস্কৃতি।

মোঃ আনোয়ারুল রাজু

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক।
উপদেষ্টা সম্পাদক, উত্তরবাংলা ডটকম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here